বর্তমানে আমি বান্দরবান জেলার একজন সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং সামাজিক সংগঠক হিসেবে অধিক পরিচিত। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি। এই সময়ে আমি প্রত্যক্ষ করেছি পাহাড়ের মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, উন্নয়ন-বঞ্চনা, সংঘাত-সংকট এবং শান্তির প্রত্যাশা।
আমার জীবন কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতির ধারাবাহিকতা নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসেরও একটি অংশ। আমার বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা—সবকিছুই এই অঞ্চলের পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
শৈশব, স্বাধীনতা যুদ্ধ ও একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠা:
আমার জন্ম ১৯৬৫ সালে বান্দরবান জেলার বর্তমান লামা উপজেলার চাম্পাতলী গ্রামে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা পাহাড়ি পরিবেশে আমার শৈশব কেটেছে। ১৯৭০ সালে লামা টিটিএন্ডডিসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। পরে লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কক্সবাজার সরকারি কলেজে অধ্যয়ন করি।
আমাদের প্রজন্মের শৈশবের সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ। যুদ্ধের সময়কার আতঙ্ক, মানুষের উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের সংগ্রাম আজও স্মৃতিতে ভাসে। স্বাধীনতা অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি আমরা দেখেছি একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার কঠিন বাস্তবতা।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধার মুখোমুখি এক কিশোর:
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। গ্রামের পথে পথে ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অভাবগ্রস্ত পরিবারের কান্না এবং অনাহারে কাতর মানুষের অসহায়ত্ব আমি নিজ চোখে দেখেছি।
আমার পিতা-মাতা সাধ্যমতো ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আমাদের ধানের গোলা থেকে ধান ও চাল বিতরণ করা হতো। বহু মানুষ আমাদের বাড়িতে এসে খাবার খেত। সেই সময় আমি উপলব্ধি করেছি—মানবতার চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই।
দুর্ভিক্ষ আমাকে শিখিয়েছে, রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
রোগ-শোকের পাহাড়ি জনপদ:
আজকের প্রজন্ম হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, সত্তর ও আশির দশকের লামা কতটা অনুন্নত ছিল। চিকিৎসাসেবা ছিল অত্যন্ত সীমিত। ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, কলেরা এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগে বহু মানুষ প্রাণ হারাত।
আমিও বহুবার ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছি। সপ্তাহের পর সপ্তাহ জ্বরে ভুগেছি। তখন চিকিৎসক সংকট ছিল প্রকট। স্থানীয় কবিরাজ, হাকিম এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই মানুষের শেষ ভরসা ছিলেন।
গুরুতর রোগীদের চকরিয়া বা মালুমঘাটে নিতে হতো। নদীপথ কিংবা দীর্ঘ দুর্গম পথ অতিক্রম করে চিকিৎসার জন্য যাত্রা করতে গিয়ে অনেক রোগী পথেই মৃত্যুবরণ করতেন।
পিতার কাছ থেকে পাওয়া মানবতার শিক্ষা:
আমার পিতা ছিলেন একজন জনপ্রতিনিধি, দানবীর ও সমাজসেবক। মানুষের বিপদে-আপদে তিনি সর্বদা পাশে দাঁড়াতেন। অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, দরিদ্রদের সহায়তা করা কিংবা সামাজিক বিরোধ মীমাংসা করা—এসব কাজে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
আমি তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি, মানুষের সেবা করাই জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। পরবর্তীতে সাংবাদিকতা ও মানবাধিকার কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার পেছনে এই পারিবারিক শিক্ষার বড় ভূমিকা রয়েছে।
সংঘাত, অস্থিরতা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা:
আমার যৌবনকাল কেটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ে সংঘাত, নিরাপত্তা সংকট, অপহরণ, চাঁদাবাজি, হত্যা এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চলেছে।
আমি প্রত্যক্ষ করেছি কিভাবে সাধারণ মানুষ দুই দিকের চাপের মধ্যে জীবনযাপন করেছে। অনেক পরিবার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটিয়েছে। ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক—কেউই অনিশ্চয়তার বাইরে ছিলেন না।
এই বাস্তবতা আমাকে মানুষের অধিকার, আইনের শাসন এবং শান্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন করে তোলে।
সাংবাদিকতায় প্রবেশ ও কলমকে অস্ত্র হিসেবে বেছে নেওয়া:
ছোটবেলা থেকেই বই, পত্রিকা ও সাময়িকীর প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। সংবাদপত্র পড়তে পড়তেই উপলব্ধি করি—একটি সত্য সংবাদ সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে।
ধীরে ধীরে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ ও মতামত পাঠাতে শুরু করি। পরবর্তীতে বিশিষ্ট সম্পাদক সাংবাদিক একে এম মকছুদ আহমদের সান্নিধ্যে এসে সাংবাদিকতার প্রকৃত শিক্ষা লাভ করি।
তিনি আমাকে শিখিয়েছেন—সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সত্য, সততা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা।
দুর্গম পাহাড়ে সংবাদ সংগ্রহের দিনগুলো:
বর্তমানের মতো তখন মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট কিংবা দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল না। একটি সংবাদ সংগ্রহের জন্য কখনো দিনের পর দিন পাহাড়ি পথে চলতে হয়েছে। কখনো নৌকায়, কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করেছি।
অনেক সময় হুমকি এসেছে। বিভিন্ন মহল অসন্তুষ্ট হয়েছে। কিন্তু সত্য প্রকাশের দায়িত্ব থেকে কখনো সরে আসিনি।
মানবাধিকার আন্দোলন ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম:
সাংবাদিকতার পাশাপাশি মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হই। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের মাধ্যমে নির্যাতিত, বঞ্চিত এবং অসহায় মানুষের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে সবসময় সোচ্চার থেকেছি।
রাজনৈতিক আদর্শ ও সংগঠনের দায়িত্ব:
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁর জাতীয়তাবাদী দর্শন ও উন্নয়ন চিন্তা আমাকে রাজনৈতিক ভাবে উদ্বুদ্ধ করে।
১৯৯২ সালে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হই। পরবর্তীতে লামা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।
রাজনীতি আমার কাছে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি প্ল্যাটফর্ম।
প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই:
সাংবাদিকতা, মানবাধিকার কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা, মামলা-মোকদ্দমা, সামাজিক চাপ এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
তবে এসব বাধা কখনো আমাকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। বরং প্রতিটি চ্যালেঞ্জ আমাকে আরও দৃঢ় করেছে।
নতুন প্রজন্মের প্রতি বার্তা:
আজকের তরুণ সমাজ প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু ইতিহাসকে ভুলে গেলে চলবে না। যে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ত্যাগ, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগ।
তরুণদের প্রতি আমার আহ্বান—সত্যকে ধারণ করো, মানবিক হও, দেশকে ভালোবাসো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়াও।
শেষ কথা:
আমার জীবনের দীর্ঘ পথচলায় আমি দুর্ভিক্ষ দেখেছি, সংঘাত দেখেছি, রোগে মানুষের মৃত্যু দেখেছি, সাংবাদিকতা করেছি, মানবাধিকারের কথা বলেছি এবং বহু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছি।কিন্তু একটি বিষয় কখনো পরিবর্তিত হয়নি—সত্য, ন্যায়, মানবতা এবং আদর্শের প্রতি আমার অটল বিশ্বাস।
মানুষের কল্যাণের জন্য কলম ধরেছিলাম। আজও সেই কলম মানুষের পক্ষে, সত্যের পক্ষে এবং ন্যায়ের পক্ষে লিখে চলেছে।
আমি কৃতজ্ঞ আমার পরিবার, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং লামা প্রেস ক্লাবের প্রতি, যারা বিভিন্ন সময়ে আমাকে সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি সততা, আদর্শ এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে চাই।
সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর ভরসা রেখেই আমার এই দীর্ঘ পথচলা অব্যাহত থাকবে। আমিন।এই সংস্করণটি বইয়ের অধ্যায়, স্মৃতিকথা সংকলন বা জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীর জন্য উপযুক্ত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
লেখক: এম রুহুল আমিন
সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠক