২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে নেত্র নিউজের সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ‘[জুলাই অনুসন্ধান] জেনারেলের দায়মুক্তি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও এর মহাপরিচালককে ঘিরে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগকে ‘বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি।
বৃহস্পতিবার বিজিবির নিজস্ব ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক লিখিত প্রতিবাদে এ কথা জানানো হয়।
প্রতিবাদে বিজিবি বলেছে, প্রতিবেদনে বিজিবির গুলিতে ৮৬ জন নিহত হওয়ার দাবি, বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার মতো অভিযোগ এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সেগুলো ইতোমধ্যে বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য। বিজিবির দাবি, অভিযোগ, প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠিত সত্যের মধ্যে প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় পার্থক্য রাখা হয়নি।
বিজিবি জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত প্রতিটি প্রাণহানি দুঃখজনক এবং এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রমাণ ও কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা জরুরি।
প্রতিবাদে বলা হয়, নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে বিজিবির মহাপরিচালকের কোন নির্দিষ্ট নির্দেশ, কীভাবে এবং কোন মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—এ বিষয়ে প্রত্যক্ষ প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। বরং বিভিন্ন ঘটনা, সাক্ষ্য, স্থিরচিত্র ও পূর্বে প্রচারিত ফুটেজ একত্র করে মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত দায়ের একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেছে বিজিবি।
বিজিবির দাবি, প্রতিবেদনে মহাপরিচালকের একটি বক্তব্য বিভিন্ন অংশে মোট নয়বার ব্যবহার করা হয়েছে। বক্তব্যটি ছিল বিটিভি ভবনে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও সরকারি সম্পদ ভাঙচুরের প্রেক্ষাপটে। কিন্তু পরবর্তী অংশে শিশু তামিম শিকদার ও কিশোর আশিকুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনা যুক্ত করায় সম্পাদনার মাধ্যমে বক্তব্যটি ওই মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে বলে অভিযোগ করেছে বিজিবি।
প্রতিবাদে আরও বলা হয়, প্রতিবেদনে মহাপরিচালকের বক্তব্যের পর ৩৬টি মৃত্যুর মধ্যে ৩৫টি ঘটেছে—এমন সময়ক্রম তুলে ধরা হয়েছে। বিজিবির বক্তব্য, কোনো বক্তব্যের আগে বা পরে কোনো ঘটনা ঘটলেই তা ওই বক্তব্যের কারণে ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ক্ষেত্রে লিখিত নির্দেশ, বেতার বার্তা বা অপারেশনাল নির্দেশনার সঙ্গে নির্দিষ্ট মৃত্যুর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক দেখানো প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে বিজিবি রামপুরার একটি ঘটনার সময়কাল উল্লেখ করে দাবি করেছে, সেখানে গুলি শুরু হয়েছিল ১৮ জুলাই রাতে, অর্থাৎ মহাপরিচালকের ১৯ জুলাই দুপুরের বক্তব্যের আগেই। ফলে শুধু সময়ের ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে বক্তব্য ও পরবর্তী প্রাণহানির মধ্যে কার্যকারণ প্রতিষ্ঠা করা যায় না বলে দাবি সংস্থাটির।
মহাপরিচালক ও একটি ব্যাটালিয়নের অধিনায়কের কথোপকথনের স্থিরচিত্র প্রতিবেদনে ব্যবহারের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিজিবি। সংস্থাটির বক্তব্য, মহাপরিচালকের মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন ও অধীনস্থ কর্মকর্তার কাছ থেকে ব্রিফ নেওয়া বাহিনীর স্বাভাবিক কমান্ড প্রক্রিয়ার অংশ। ছবিতে মিডিয়া ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিও দেখা যায়। তাই শুধু ওই স্থিরচিত্রের ভিত্তিতে কোনো নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যথাযথ নয় বলে দাবি করেছে বিজিবি।
কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় প্রসঙ্গে বিজিবি বলেছে, কোনো বাহিনীর প্রধান হওয়ার কারণে অধীনস্থ প্রত্যেক সদস্যের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের ব্যক্তিগত দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাহিনীপ্রধানের ওপর বর্তায় না। নির্দিষ্ট নির্দেশ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জ্ঞান, অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা কিংবা পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণে ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতার মতো বিষয় প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
প্রতিবাদে নিহতের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিজিবি। তাদের দাবি, একই প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশে নিহতের সংখ্যা ৬১, ৬৩ ও ২৭ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ভিডিওতে ‘অন্তত ৮৬’ জনের কথা বলা হয়েছে। অনুসন্ধানের সময় তথ্য হালনাগাদ হয়ে থাকলে কোন নতুন তথ্যের ভিত্তিতে সংখ্যা পরিবর্তন করা হয়েছে এবং কোন মৃত্যুকে কী প্রমাণের ভিত্তিতে বিজিবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন ছিল বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
সিলেটের গোলাপগঞ্জের একটি ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বিজিবি বলেছে, কোনো স্বজনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোন অস্ত্রের গুলিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে তা নির্ধারণে ময়নাতদন্ত, ব্যালিস্টিক পরীক্ষা ও অন্যান্য ফরেনসিক প্রমাণ প্রয়োজন। বিজিবির দাবি, ওই ঘটনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ ও বিজিবি কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়েছিল এবং ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষ্য অনুযায়ী ওই গুলিতে কেউ হতাহত হননি।
রামপুরার ডেল্টা হাসপাতালের ঘটনায় প্রতিবেদনে ব্যবহৃত দৃশ্য এবং পূর্বে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোর মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে বলে দাবি করেছে বিজিবি। একইভাবে গোলাপগঞ্জে নাজমুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনায় পূর্বে প্রকাশিত সংবাদে পুলিশের গুলিবর্ষণের কথা উল্লেখ করা হলেও নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে তাকে বিজিবির গুলির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবাদে উল্লেখ করা হয়। বিজিবির মতে, এ ধরনের ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত, ব্যালিস্টিক বা অন্যান্য ফরেনসিক তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে বিজিবির অস্থায়ী ক্যাম্প থাকার দাবিরও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি। তাদের দাবি, সেখানে বিজিবির কোনো ক্যাম্প ছিল না। এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে মোতায়েন আদেশ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কিংবা যাচাইযোগ্য ভিডিওসহ প্রমাণ উপস্থাপন করা প্রয়োজন ছিল।
বিজিবি আরও বলেছে, প্রায় ৬০ হাজার সদস্যের একটি বাহিনীর মহাপরিচালকের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে একাধিক স্তরের কমান্ড কাঠামো রয়েছে। ফলে কোনো ঘটনার জন্য মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত দায় প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্দিষ্ট নির্দেশ কীভাবে কমান্ড কাঠামোর মধ্য দিয়ে মাঠপর্যায়ে পৌঁছেছে এবং কীভাবে তা নির্দিষ্ট ঘটনার কারণ হয়েছে, তার প্রমাণ প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে ‘যুদ্ধক্ষেত্রেও হয়নি’ ধরনের তুলনা ব্যবহারের সমালোচনাও করেছে বিজিবি। তাদের দাবি, এ ধরনের তুলনার ক্ষেত্রে কোন যুদ্ধ, কোন সময়কাল এবং কোন তুলনামূলক তথ্যের ভিত্তিতে বক্তব্যটি দেওয়া হয়েছে, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।
বিজিবি বলেছে, তারা কোনো বৈধ তদন্ত, বিচার বা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয় এবং নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করে আসছে। তবে অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে সুস্পষ্ট সম্পর্ক ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণ করা উচিত নয়।
প্রতিবাদে সংস্থাটি আরও বলেছে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক সমাজে অপরিহার্য। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তথ্যের যথার্থতা, প্রেক্ষাপট, ন্যায্যতা ও যাচাইয়ের ওপর। অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য, সময়ের ধারাবাহিকতাকে কার্যকারণ, স্থিরচিত্রকে নির্দেশের প্রমাণ এবং অসম্পূর্ণ তথ্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছে বিজিবি।

পাঠক সংখ্যা২২