ঢাকা শহরে পরিবেশ সুরক্ষা করার দায়িত্ব কি শুধু পরিবেশ সংগঠন নাকি পরিবেশ অধিদপ্তরের। বিষয়টি নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে ঢাকাবাসীর মধ্যে। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বটা কার, প্রশ্ন উঠছে নগরবাসীর নাকি সিটি করপোরেশন। কথা বলছিলাম পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে। কোরবানি ঈদ আসলেই পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নিয়ে এক থেকে দেড়মাস আগেই সিটি করপোরেশন পরিকল্পনা করেন পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে। পরিবেশ সুরক্ষায় সেই বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য বিশাল কর্মযজ্ঞের আয়োজন করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। বিশাল কর্মযজ্ঞের আয়োজন করতে শুরু হয় উপকরণ কেনাকাটা। আর এই পলিব্যাগ সরবরাহের ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মতে। চলতি বছরের মে মাসের ২৮ তারিখ কোরবানি ঈদে তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না নগরবাসী। তেমনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ হন। অভিযোগ উঠেছে, বিগত কয়েক বছরের মধ্যে রাজধানীতে এত বাজে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দেখা যায়নি। অব্যবস্থাপনার দায়ে কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে অব্যবস্থাপনার পেছনের কারণ খোঁজ করেনি কতৃপক্ষ। তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৪ কোটি ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ১০০ টাকা বরাদ্দ করে। পলিব্যাগ সরবরাহ করে গাজীপুর শ্রীপুর মরগান ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড থেকে যার মালিক মো. নিয়াজ আলী চিশতী।

ডিএনসিসি যে টাকা বরাদ্দ করে তার বিনিময়ে ১৭ লাখ ৩০ হাজার পলিব্যাগ সরবরাহ করে।আর এই পলিব্যাগ ধরণ আকার নিয়ে উঠেছে অভিযোগ, সুকৌশলে  নির্ধারিত মাপ ও চাহিদার চেয়ে কম পুরুত্বের পলিথিন ব্যবহার করেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া বাজারমূল্যের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি দামে কেনা হয়েছে পলিব্যাগ। বাজারে যে ব্যাগ ৮-১০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, সেটি কেনা হয়েছে প্রায় ২৪ টাকায়। ডিএনসিসির কর্মকর্তাদের সহায়তা ছাড়া এমন অনিয়ম ঘটা সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী, প্রতিটি পলিব্যাগের দৈর্ঘ্য ৩৫ ইঞ্চি ও ২৩ ইঞ্চি প্রস্থ হওয়ার কথা। কিন্তু নগরবাসীকে বিতরণ করা ব্যাগে দৈর্ঘ্য-প্রস্থে এক ইঞ্চি থেকে ২ ইঞ্চি পর্যন্ত কম পাওয়া গেছে।

ডিএনসিসির টেন্ডারের টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী, প্রতিটি পলিব্যাগের পুরুত্ব সিঙ্গেল সাইডে কমপক্ষে ৫০ মাইক্রোন এবং ডাবল সাইডে ১০০ মাইক্রোন থাকার কথা। অর্থাৎ পলিব্যাগের এক পাশের প্লাস্টিক স্তরের পুরুত্ব কমপক্ষে ৫০ মাইক্রোন এবং দুই পাশ একসঙ্গে ধরলে মোট পুরুত্ব ন্যূনতম ১০০ মাইক্রোন হতে হবে।
তবে ঢাকা উত্তরে নাগরিকদের কাছে সরবরাহ করা ব্যাগের একাধিক নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করে ন্যূনতম মানের চেয়ে প্লাস্টিকের কম পুরুত্ব পাওয়া গেছে। পলিথিন উৎপাদনকারী একাধিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন এ প্রতিবেদক। তাদের মেশিনে ডিএনসিসির সরবরাহ করা পলিব্যাগে সিঙ্গেল সাইডের পুরুত্ব ৪০ মাইক্রোন পাওয়া যায়। বিতরণ করা ব্যাগগুলোর পুরুত্বের পাশাপাশি দৈর্ঘ্য-প্রস্থও সঠিক পাওয়া যায়নি। গাবতলী, ভাটারা, নিকেতন ও রামপুরা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার কাছ থেকে এ ধরনের কিছু পলিব্যাগের নমুনা সংগ্রহ করেন এ প্রতিবেদক। এ ছাড়া মিরপুরের দুটি ওয়ার্ডের বিএনপির দুজন নেতা, ডিএনসিসির একজন পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শক এবং বাড্ডা এলাকার এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাছ থেকেও ব্যাগের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

অবশ্য ঈদের আগে ডিএনসিসি নগরভবন থেকে সংগ্রহ করা ব্যাগের পুরুত্ব ও পরিমাপে কোনো দুর্বলতা পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা নমুনা ব্যাগের আকার ও পুরুত্ব ঠিক থাকলেও নগরবাসীকে বিতরণ করা হয়েছে আলাদা ব্যাগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা  বলেন, উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশনকে কিছু ব্যাগ ঠিকঠাক তৈরি করে দিয়েছে। তবে বাকিগুলোর আকার, আয়তন ও পুরুত্ব ছিল কম। দুই ধরনের ব্যাগ পাশাপাশি রাখলেই মানের পার্থক্য স্পষ্ট বোঝা যায়।
এ ছাড়া চাহিদার চেয়ে বেশি ব্যাগ কেনার ঘটনা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। অনুসন্ধানে জানা যায়, কোরবানির বর্জ্য অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় পলিব্যাগের একটি চাহিদাপত্র তৈরি করেছিল ডিএনসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ। সেখানে অঞ্চলভিত্তিক চাহিদার পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে। ডিএনসিসির কেন্দ্রীয় কন্ট্রোলরুমসহ ১০ অঞ্চলে মোট চাহিদা ছিল ১৬ লাখ ৩০ হাজার পিস। এর মধ্যে ৫০ হাজার পলিব্যাগ ডিএনসিসির কেন্দ্রীয় কন্ট্রোলরুমের জন্য নির্ধারিত ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত টেন্ডারের মাধ্যমে ব্যাগ কেনা হয় ১৭ লাখ ৩০ হাজার পিস। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে এক লাখ পিস বেশি।

অভিযোগ উঠেছে, ওয়ার্ড পর্যায়ে কাউন্সিলর না থাকায় এবার কোরবানির ঈদের সময় সিটি করপোরেশনের পলিব্যাগ নগরবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার মূল দায়িত্ব পালন করেন ক্ষমতাসীন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
তবে বড় অভিযোগ হলো সিটি করপোরেশন এখনো নিয়ন্ত্রণ করেন পুরনো সিন্ডিকেট। বিগত ১৭ বছরে যেসব কর্মকর্তা কর্মচারী ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান গুলো সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলো এখনো তারাই বহাল তবিয়তে কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে বলে বিশ্বস্ত সুত্রে জানা যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএনসিসির কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুমের জন্য নির্ধারিত ৫০ হাজার পলিব্যাগ স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ঠিকঠাক দিয়েছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। বাকি ১৬ লাখ ৮০ হাজার পলিব্যাগেই কোনো না কোনো ঘাটতি রয়েছে। ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ব্যাগ পরিমাপ করেও এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। চাহিদার চেয়ে ১ লাখ ব্যাগ বেশি কেনা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রয়োজনসহ বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পলিব্যাগে জালিয়াতি ও বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে কেনার ক্ষেত্রে অন্তত দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।
১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত ২০০২) অনুযায়ী, দেশে পলিথিন শপিংব্যাগের উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। এরপরও খোদ সিটি করপোরেশন কেন এ ধরনের ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে তা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ৫০ মাইক্রোনের ওপরের পলিথিন বারবার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা গ্রহণযোগ্য। সে হিসাব করেই ডিএনসিসি টেন্ডারের শর্তে পলিব্যাগের এক সাইড ৫০ মাইক্রোন এবং উভয় সাইডে ১০০ মাইক্রোন উল্লেখ করে দেয়। কিন্তু অনিয়ম ও সূক্ষ্ম জালিয়াতির মাধ্যমে সেই ব্যাগের পুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আর্থিক দুর্নীতির পাশাপাশি পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাতলা পলিথিন সহজেই ছিঁড়ে দ্রুত বর্জ্যে পরিণত হয়। এগুলোর পুনর্ব্যবহার যোগ্যতা থাকে না এবং শেষ পর্যন্ত ড্রেন-নালায় জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। পরিবেশবাদীদের মতে, যেসব পলিব্যাগ ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে বলছে আসলে এগুলো অনুপযোগী বরং পরিবেশকে আরও ধ্বংস করার পায়তারা। পুরো সিস্টেমকে একটা দুর্নীতির আখরা করে তুলছে।
পরিবেশবাদীরা আরও বলেন, পলির পুরুত্ব ৫০ মাইক্রোনের কম হলে আমরা পলিথিন বলি, আর এর উপরে গেলে প্লাস্টিকের ব্যাগ বলি। এ জন্য সিটি করপোরেশন স্পেসিফিকেশন ঠিক করে দিয়েছে। পণ্যের যে স্পেসিফিকেশন দেওয়া হয়, সেটা সুবিধা বিবেচনা করেই করা হয়। মাইক্রোন কম হলে স্বাভাবিকভাবেই পলিথিন ছিঁড়ে যাবে। ছিঁড়ে গেলে সেই বর্জ্য যেখানে-সেখানে পড়ে পরিবেশ নষ্ট করবে। পলিথিনের পুরুত্ব কমবেশি যাই হোক না কেন, এর ক্ষতিকর দিক আছেই। তাই সরকারকে এগুলোর বিকল্প চিন্তা করতে হবে। চলতি বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পলিব্যাগ বাদ দিয়েছে। এভাবে সবাইকে পলিথিন ব্যবহার থেকে সরে আসতে হবে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর ধারা ১৫ লঙ্ঘন ঘটেছে। পণ্য চুক্তি ব্যবস্থাপনা বিধি ৫৫ ও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের ফলে সরবরাহ করা পণ্যের বিল পরিশোধের বিষয়টি বৈধতা পায়নি। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সিটি করপোরেশনের উচিত স্বচ্ছতার স্বার্থে বিষয়টি আমলে নেওয়া।
নগরে সরবরাহ করা পলিব্যাগের নমুনার আকার ও মান যাচাই করে এ খাতের দুজন ব্যবসায়ী জানান, এই ব্যাগ তৈরিতে ৫ টাকার বেশি লাগার কথা না। খুব ভালো মানের ব্যাগের দামও ৭ থেকে ৮ টাকা হতে পারে। এর সঙ্গে ব্যাগের ওপরের লেখা হুল, ভ্যাট-ট্যাক্স মিলে সর্বোচ্চ ১০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। এ হিসাবে বাজারদরের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি দামে নিম্নমানের ব্যাগ কিনেছে ডিএনসিসি।
ব্যাগে ব্যবহার করা কালির মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোরবানির দিন হালকা বৃষ্টির পানিতেই ডিএনসিসির লোগোসহ সচেতনতামূলক স্লোগান উঠে যায়। আবার কোথাও বর্জ্যরে ভারে ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে। গাবতলীর বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, কোরবানির আগে তারা তিনটি ব্যাগ পান। এর মধ্যে একটি ব্যাগে কোরবানির বর্জ্য নিয়ে প্রধান রাস্তায় যাওয়ার আগেই ছিঁড়ে যায়। এ জন্য বাকি দুটি ব্যাগ আর ব্যবহার করেননি।
ভাটারা এলাকার সচেতন নাগরিকরা বলেন, যে ব্যাগ সিটি করপোরেশন পাঠিয়েছে খুবই নিম্নমানের এবং সেখানে বর্জ্য নিলে পুরো রাস্তা ঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তো, তাই বাজার থেকে আমরা নিজেরাই ভালো দামের মোটা পলিব্যাগ সংগ্রহ করি।

সিটি করপোরেশন এক কর্মকর্তা বলেন , ঈদের আগেই ডিএনসিসির ভান্ডারে টাইট পরীক্ষা হয়েছে। যে সময় সাংবাদিকসহ কর্মকর্তাদের সামনে ৩৫ কেজি লোড দিয়ে ব্যাগগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই।#

সুত্র : দেশ রূপান্তর

পাঠক সংখ্যা১