বাংলার লোকায়ত সাধনায় শাহ আবদুল করিমের পূর্বসূরী বাউল-মরমিসাধকদের সাধনার পরম্পরাকে শিরোধার্য করেই করিমের সৃষ্টিকর্মে প্রতিফলিত আধ্যাত্মিকতার স্বরূপ নির্ণয় করতে হবে। তাই সুপ্রাচীনকালের উৎসভূমি হতে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত অধ্যাত্মবাদী চিন্তার একটি ধারাবাহিক রূপরেখা সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা হলো। কারণ করিমের গানে প্রতিফলিত আধ্যাত্মিকতার শেকড়ও লোকায়ত-দর্শনের উৎসমূলেই প্রোথিত। তবু করিমের অধ্যাত্মবাদী গানগুলোতে গতানুগতিক ধারার পাশাপাশি নবতর দৃষ্টিভঙ্গিও চোখে পড়ে। প্রচলিত আঙ্গিকের ছাঁচ ভেঙে তিনি পরিবেশন করেছেন অভিনব বাক্-ভঙ্গি ও সুর-মাধুরী। উপমা-উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, যুক্তিবাদী বক্তব্যে এসব আধ্যাত্মিক গান পেয়েছে অনন্য মাত্রা।
তবে রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মবাদী চেতনার সঙ্গে লোকায়ত সাধকদের আধ্যাত্মিকতার ধরনে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা উপনিষদ বা বাউল-দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হলেও একে ব্যক্তিগত অধ্যাত্মবাদী চেতনার রূপান্তর বলা যায়, অপরদিকে লোকায়ত সাধনায় অধ্যাত্মবাদকে গোষ্ঠীগত বা সামষ্টিক চেতনার প্রসূন বললে অত্যুক্তি হবে না। কেননা প্রতিটি সহজিয়া মতবাদেই একটি বিশেষ সাধক গোষ্ঠীর সাধন-ধারা প্রতিফলিত হয়। বাউল, বৈষ্ণব, নাথ-যোগী-সুফি প্রভৃতি মতবাদে স্ব-স্ব সম্প্রদায়েরই আচার, রীতি, বিশ্বাসের স্বতন্ত্র ছাপ বিদ্যমান। তাই কবীর, চৈতন্য, লালন, হাসন, রাধারমণ, মনোমোহন, রশিদ উদ্দিন, জালাল উদ্দীন খাঁ, দুর্বিন শাহ, সৈয়দ শাহনুর, দ্বিজ দাস প্রমুখ এমনকি শাহ আবদুল করিমের আধ্যাত্মিকতার স্বরূপ লোকায়ত ধারার সেই সম্প্রদায়গত সামষ্টিক ভিত্তিভূমি থেকেই উৎসারিত।
যদিও ঐতিহ্য (Tradition) এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের (Individual) অপূর্ব সংশ্লেষণে প্রত্যেকের গানই পেয়েছে অনন্য মাত্রা। তবে শাহ আবদুল করিমের গানে ঐতিহ্য (Tradition) এবং ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবোধের অভূতপূর্ব শৈল্পিক সংশ্লেষ ঘটেছে। তাঁর গান হয়ে উঠেছে ভিন্নধর্মী; নবমাত্রিকতায় ও সহজতায় যা অনায়াসে শ্রোতার তনু-মনকে আন্দোলিত করে। লোকায়তনিক হয়েও যা নিজস্বতার স্পর্শে স্বতন্ত্র।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের আধ্যাত্মিকতায় কেবল ব্যক্তি মানুষের আত্মনিবেদনের সুর ঝংকৃত হয়েছে। কিন্তু একজন শাহ আবদুল করিমের অধ্যাত্ম-চিন্তা সেই লোকায়ত ধারারই নির্যাস, যেখানে একটি সম্প্রদায়ের গোষ্ঠীগত জীবনপ্রবাহের অভিঘাতে সৃষ্ট বিশেষ কোনো চেতনা কিংবা জীবন-সংগ্রামেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। যাপিত জীবনের গণ্ডিতে দাঁড়িয়ে তাঁরা স্বীয় সমাজ ও সম্প্রদায়েরই প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের গানও হয়ে যায় সেই বিশেষ জনগোষ্ঠীর গান। তাঁদের আধ্যাত্মিক গানের বাণী ও সুরে ধ্বনিত হয় সমষ্টির পারমার্থিক মুক্তির দ্যোতনা।
মধ্যযুগে মুসলমান বিজয়ের ফলে ইসলাম ধর্মের প্রসারের কালে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধপূর্ণ দুটো সম্প্রদায়কে পণ্ডিতগণ, রাজনীতিক ও সমাজ-হিতৈষীগণ যখন মেলবন্ধন ঘটাতে পারছিলেন না তখন অশিক্ষিত লোকায়ত সাধকরাই সমাজে সমন্বয়বাদী সম্প্রীতির সুবাতাস বইয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরাই কিছুটা শান্তি ও স্বস্তির প্রলেপ দিতে সক্ষম হন জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষ সাধারণ মানুষের জীবনে। চৈতন্য দেবেরও পূর্বে কবীর, দাদু প্রমুখ প্রেম-ভক্তির সম্মিলনে অপূর্ব ভাবান্দোলন ঘটিয়েছিলেন, যা ভারতের প্রায় সর্বত্র ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছিল। এক্ষেত্রে ব্যক্তিক পর্যায়ে কোনো লোকসাধকের অবদান সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে কবীরের প্রভাব ও অবদানের কথা সর্বাগ্রে স্থান দিতে হয়।
রামানন্দ-শিষ্য কবীর গুরুর দীক্ষা নিয়ে অন্তরে প্রেম-ভক্তির জাগরণ ঘটিয়ে আচার-যজ্ঞকে নির্বাসন দিয়ে অন্তরেই সারবস্তু অনুসন্ধান করলেন। বাহ্যিকতায় নয়, আপনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে পরম সত্য, ব্রহ্ম বা ঈশ্বর; তাঁকে বাইরে খোঁজ করা বৃথা। এমন প্রত্যয়ই কবীরকে উদার, মুক্ত জীবনদৃষ্টিসম্পন্ন সমন্বয়বাদী দার্শনিকে পরিণত করে। ধর্মে-ধর্মে বিভেদ, হানাহানি, মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ কবীরের কাম্য নয়। তাই কবীরের মীমাংসা বাণী:
জৌর খুদাই মসজিদ বসতু হৈ ঔর মুলুক কিসকেরা।
তীরথ মুরত রাম নিবাসী দুহুমেঁ নিকহুঁ ন হেরা॥
পুরব দিসা হরীকা বাসা পছিম অলহ মুকামা।
দিলহী খোজি দির্লে ভিতরে ইহাঁ রাম রহিমানা॥
অর্থাৎ, মন্দিরে বা মসজিদে খোদাকে খোঁজ করে এই বিবাদ মিটবে না। তিনি সকলের অন্তরেই বসত করেন। মানবদেহের মধ্যেই যদি স্রষ্টাকে খুঁজে পাওয়া যায় তবেই গোল মিটে যাবে। তাকে অন্তরেই তালাশ করতে হবে। খোদা যদি কেবল মসজিদেই থাকেন জগতের বাকি অংশ তবে কার? তীর্থস্থানে না, পূবে হরি থাকেন, আর পশ্চিমে আল্লাহ—এসব না ভেবে অন্তরে খুঁজে দেখো, সেখানেই রাম-রহিমজনের বসতি।
কবীরের এই নূতন প্রেম-ভক্তির নৈবেদ্য এতটাই শক্তিমান হয়ে উঠলো যে তা পরবর্তীকালের লোকসাধকদের ব্রত হয়ে দাঁড়ালো। তা না হলে কবীরের হিন্দি ভাষার এই দোহা একালের লোককবিগণকেও কীভাবে এতটা আক্রান্ত করে! বাংলাদেশের অনেক লোককবির গানে কবীরের এই গানটির সরাসরি প্রভাব লক্ষ করা যায়। রাধামরণ দত্ত লিখলেন, ‘মন্দিরে দেবতা নাই/অন্তরে খোঁজ তারে’। মনোমোহন দত্ত লিখলেন, ‘ঘরে নাই আল্লা রাধা দোস্ত মুহাম্মদ/অযুতে মজুদ সাঁই দমে কিয়াম্মত।
শাহ আবদুল করিম এই ভাবনাটিকেই অসাধারণ কাব্যময়তায় ফুটিয়ে তোলেন:
“মনের মানুষ অতি ধারে
মক্কা কাশী বৃন্দাবন নাই তার প্রয়োজন
ভক্ত যে-জন হইতে পারে॥
হিন্দু কি মুসলমান শাক্ত বৌদ্ধ খ্রিস্টান
সকলই সমান প্রেমের বাজারে
তত্ত্বজ্ঞান জাগে যার ঘুচে যায় আঁধার
কেহ ঘোরে অন্ধকারে॥
করিমের এই গানটি কবীরের সেই বিখ্যাত দোহার ভাব ও বক্তব্যের অনুগামী হয়েও সম্প্রসারিত ভাষ্যরূপে গণ্য হতে পারে। এছাড়া গানটির সাহিত্যিক সৌকর্য অবশ্যই স্বকীয়তায় ভাস্বর। কবীরের পর কত কবি-সাধকেরাই এমন ভাবনার অনুরণন তোলেন। মধ্যযুগের বৈষ্ণবকবি চণ্ডীদাস বলেন, ‘শুনহ মানুষ ভাই/সবার উপরে মানুষ সত্য/তাহার উপরে নাই’। নজরুলে আরও সূক্ষ্মতর উপলব্ধির প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়, ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় মন্দির কাবা নাই’। হয়তো তিনি আপন হৃদয়েই খুঁজে ফেরেন প্রেমাস্পদকে কিংবা প্রত্যাশিত পরমকে। তাই তিনি বলতে পারেন, আমার আপনার চেয়ে আপন যেজন/ খুঁজি তারে আমি আপনায়।
মনোমোহন দত্ত দৃপ্তকণ্ঠে গাইলেন:
“কাজ কিরে মন গয়া গঙ্গা, যেয়ে কুরুক্ষেত্র কাশী।
প্রাণের ভিতর যদি মোর, প্রেমে বাজায় ভাবের বাঁশি॥
ভাবতে গিয়ে মনোমোহন, ভুলে যায় আপনি আপন;
দেখবে যদি জন সাধারণ, প্রাণে লাগাও প্রেমের ফাঁসি।
করিমের সাবলীল ছন্দ-ভাষ্যে ও প্রাণময় প্রকাশভঙ্গিমায় এবং অপূর্ব দ্যোতনায় ভাবটি কাব্যরূপ পরিগ্রহ করে:
“মসজিদ-মন্দির-গির্জাঘরে
কেউ খোঁজে জঙ্গল-পাহাড়ে
আবদুল করিম বিশ্বাস করে
আমাতে তুমি রয়েছ॥
কবীরের সমন্বয়বাদী দর্শনে ‘জ্যান্তে-মরা’ তত্ত্বটি অপূর্ব মাধূর্যে প্রতীকায়িত হয়েছে। যা সুফি ভাবধারায়ও পরিলক্ষিত হয়। ‘ফানানিল্লাহ’ বা আত্মবিলয় ও ‘জ্যান্তে-মরা’ প্রায় সমার্থক দ্ব্যর্থবোধক তত্ত্ব। জাগতিকতা থেকে প্রভাবমুক্ত হয়ে, প্রবৃত্তির তাড়না থেকে নিরপেক্ষ ও নির্মোহ থেকে কেবল স্রষ্টার ধ্যানে নিমজ্জনকে ‘জ্যান্তে-মরা’ তত্ত্বের তাৎপর্যরূপে গণ্য করা যায়। কবীরের এই তত্ত্বটি সম্ভবত সুফিবাদেরই প্রভাবজাত হয়ে থাকবে। তবে বাউল মতাদর্শেও কবীরের ‘জ্যান্তে-মরা’ তত্ত্বের বহুমাত্রিক প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। বাউলাঙ্গিকের এসব গানে আধ্যাত্মিক প্রেরণাই মুখ্যত ক্রিয়াশীল।
কবীর বলেন, ‘জীবত মে মরণা ভলা জো মরি জানৈ কোয়।’ অর্থাৎ, মরিতে যদি জান তবে জীয়ন্তেই মর, ইহাই সার পথ। তবে এ-মরা পরমকে লাভ করার সাধনায় মরা। কোনো তুচ্ছার্থে বা ইহজাগতিকতার প্রলোভনে এ মরণ নয়।
শাহ আবদুল করিমের অনেক গানে এই পারমার্থিক তত্ত্বটি চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। নিটোল প্রেমের গানেও করিম তাৎপর্যপূর্ণ এই তত্ত্বটি প্রয়োগ করেন:
“বন্ধু হারা জিতে মরা মনপ্রাণ উতলা
সখি গো, কেমন করে ঘরে রই একেলা॥
কবীরের দোহা পাঠ করে কিংবা প্রভাবিত হয়ে করিম এসব তত্ত্ব ব্যবহার করেননি। বরং লোক-ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তিনি এসব দ্ব্যর্থবোধক ভাব-চেতনা অর্জন করতে সক্ষম হন।
কবীরের ‘জ্যান্তে-মরা’ ভাবনাকে বৈষ্ণবীয় প্রেমরসে জারিত করে করিম গাইলেন:
আগুনের তুলনা হয় না প্রেম-আগুনের কাছে
নিভাইলে নিভে না আগুন কী করে প্রাণ বাঁচে গো॥
বলে বলুক লোকে মন্দ কুলের ভয় কি আছে
আবদুল করিম জিতে মরা বন্ধু পাইলে বাঁচে গো॥”
তবে করিমের এসব গানের বিষয়-ভাবনা, উপমা-প্রতীক প্রভৃতির প্রয়োগ-কুশলতায় দ্বি-মাত্রিক তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়। এতে লৌকিক এবং লোকাতীত যুগপৎ প্রেমের আস্বাদ পাওয়া যায় অনায়াসে।
একটি গানের উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করা যায়:
আমি ফুল, বন্ধু ফুলের ভ্রমরা
কেমনে ভুলিব আমি বাঁচি না তারে ছাড়া॥
না আসিলে কালো ভ্রমর কে হবে যৌবনের দোসর
সে বিনে মোর শূন্য বাসর আমি জিয়ন্তে মরা॥
স্রষ্টা এবং সৃষ্টির প্রেমময় সম্পর্কের স্বরূপটিকে তিনি ‘ফুল’ এবং ‘ভ্রমর’-এর উপমায় মূলত এদের মধ্যকার নিবিড় সম্পর্কের তাৎপর্যকে প্রতীকায়িত করেছেন। এই গানের তাৎপর্য নিরূপণে সুফিবাদী ভাবধারা কিংবা বৈষ্ণব প্রেমবাদী তত্ত্ব ও চেতনাকে অনায়াসে আশ্রয় করা যায়। আশেক-মাশুক কিংবা জীবাত্মা-পরমাত্মার প্রেমময় সম্পর্কের স্বরূপ সন্ধানে লোকায়তনিক জীবন-সীমাতেই অবস্থান করেন, আকাশবিহারী হননি মোটেও। লোকায়ত জীবন ও সমাজ থেকেই সংগ্রহ করেন উপমা-প্রতীক-চিত্রকল্পসহ যাবতীয় অনুষঙ্গ। আধ্যাত্মিক ভাবনাকেও তিনি অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে জারিত করে নেন।#
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
২য় ও ৩য় পর্বে পরবর্তী অংশ ——//