১৭৯৫ সালে যখন গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ কলকাতায় প্রথম বাঙালি অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে ‘বেঙ্গলি থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখনকার ঔপনিবেশিক পরিমণ্ডলের সংকট আর ২০২৬ সালের বর্তমান নাট্যজগতের সংকটের মধ্যে এক অদ্ভুত এবং বেদনাদায়ক সোয়া পরিমাণ মিল রয়েছে।

​লেবেদেফ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত থিয়েটারের এই দীর্ঘ যাত্রায় সংকট, সমস্যা এবং সম্ভাবনাগুলো চক্রাবর্তিক। লেবেদেফকে তাঁর নাট্যশালা গড়তে নিজের পকেটের টাকা খরচ করতে হয়েছিল, ধার করতে হয়েছিল এমনকি বন্ধকও রাখতে হয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত সামগ্রী। আজও গ্রুপ থিয়েটার বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট নাট্যচর্চার প্রধানতম সংকট হলো অর্থ।

কর্পোরেট স্পন্সরশিপ,ব্যক্তিগত বা সরকারি অনুদানের ক্ষেত্রে যে রাজনীতি ও চক্রান্ত চলে তা লেবেদেফকেও সহ্য করতে হয়েছিল। আমাদের অনেকেই বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস পড়তে গিয়ে জেনেছি তার থিয়েটার পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তাকে দেশছাড়া করা হয়েছিল। লেবেদেফের সাফল্যের পর যোসেফ ব্যাটেলের মতো তৎকালীন ব্রিটিশ নাট্যব্যবসায়ীরা চক্রান্ত করে তাঁর থিয়েটার বন্ধ করে দিয়েছিল বলে কথাও প্রচলিত আছে। আজও এই জগতে দলবাজি, ঈর্ষা, হলের বুকিং পেতে হিমশিম খাওয়া এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার অভাব নতুন ও প্রতিভাবান নাট্যকর্মীদের কোণঠাসা করে রাখে। তার সাথে আছে অধিকাংশ নাট্যকর্মী​র নিষ্ঠার অভাব ও অন্যমনস্কতা।

লেবেদেফ যখন কাজ করেছিলেন, তখন পেশাদারিত্বের অভাব ছিল একরকম—কারণ সেটি ছিল একদম শুরুর দিক। কিন্তু আজ সব রকম উপকাঠামো বা পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও আমাদের অধিকাংশের চর্চায় এক ধরনের অন্যমনস্কতা গ্রাস করেছে। থিয়েটারকে অনেকেই এখন চূড়ান্ত সাধনা না ভেবে মিডিয়ায় বা অন্য কোনো মাধ্যমে যাওয়ার ‘লঞ্চপ্যাড’ বা সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে স্বীকার করতেই হয় সেই গভীর নিষ্ঠা বা থিয়েটারের প্রতি যে আত্মত্যাগ, তা কমছে।

​তবুও থিয়েটার আন্দোলিত করে চলছে। ​সব চক্রান্ত এবং সীমাবদ্ধতা পেরিয়েও থিয়েটার যে আজও মানুষকে আন্দোলিত করছে, তার পেছনে রয়েছে অদম্য কিছু নাট্যকর্মী ও ​লাইভ যোগাযোগের শক্তি। থিয়েটার হলো সরাসরি মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম। স্ক্রিনের ওপার থেকে যা সম্ভব নয়, মঞ্চের অভিনেতা ও দর্শকের মাঝখানের সেই জীবন্ত শক্তি চক্রান্ত,অবহেলা,লাঞ্ছনা দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।

​লেবেদেফ যেমন ঔপনিবেশিক শাসনের মাঝে দাঁড়িয়েও দেশীয় সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিতে চেয়েছিলেন, আজকের থিয়েটারও তেমনি সমাজের অন্যায়, বৈষম্যদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সৎ প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে কাজ করে চলেছে
​কতিপয় মানুষের তীব্র নিষ্ঠা ও সততার কারণে। অধিকাংশের মধ্যে অন্যমনস্কতা থাকলেও, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ এখনও থিয়েটারকে তাঁদের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। এই মানুষগুলোর নিঃস্বার্থে কাজ করে যাওয়ায় থিয়েটারকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

লেবেদেফের সময় ও ​বর্তমান সময়ের সম্ভাবনা-​সমস্যা একই থাকলেও, বর্তমান সময় নাট্যচর্চাকে অল্টারনেটিভ থিয়েটারের মতো নতুন ধারণা গুলো নতুন সম্ভাবনাও এনে দিয়েছে।
​বিকল্প স্পেসে থিয়েটার বড় হলের চক্রান্ত বা চড়া ভাড়ার ওপর নির্ভর না করে এখন অনেকেই ড্রয়িংরুম থিয়েটার, ক্যাফে থিয়েটার বা ওপেন-এয়ার থিয়েটারের দিকে ঝুঁকছেন।

এটি লেবেদেফের মতো একা লড়ার ক্ষমতা দেয়। ​সাথে আছে আলোকসম্পাত, শব্দ প্রক্ষেপণ এবং মাল্টিমিডিয়ার সঠিক ব্যবহার থিয়েটারের দৃশ্যগত ভাষাকে অনেক বেশি আধুনিক ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে, যা নতুন প্রজন্মের দর্শকদের টানতে পারে। লেবেদেফে অনেকটা একা ছিলেন এবং সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। আজ আমাদের সুবিধা হলো আমরা একা নই, লেবেদেফের বরাতে আমাদের একটা দীর্ঘ ঐতিহ্য তৈরী হয়েছে।

কিন্তু সংকট কাটাতে হলে আমাদের সেই অন্যমনস্কতা ও নিষ্ঠার অভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অবহেলা-চক্রান্ত-লাঞ্চনা সবসময়ই থাকবে, কিন্তু সততা ও দলগত দায়বদ্ধতাই পারে থিয়েটারকে সমকালীন সংকটের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে প্রতিনিয়ত আন্দোলিত রাখতে।

পাঠক সংখ্যা২৭