(বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সরকার ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মজুত রয়েছে।)

টানা ৭ দিনর ভারী বর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাণহানি ঘটনা যেভাবে ঘটছে  তেমনি দুর্ভোগও বাড়ছে। গত ৪ জুলাই রাত থেকে টানা বৃষ্টি শুরু হওয়া এই দুর্যোগে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৯ লাখ ৩০ হাজারের মতো মানুষ। এ পর্যন্ত প্রাণহানির হয়েছে ৪৩ জনের মতো। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায়, যেখানে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে আটজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙ্গামাটিতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে চট্টগ্রাম নগরীসহ জেলার ১৬টি উপজেলায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। দুর্গতদের আশ্রয়ের জন্য ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ২৩ হাজার ৮৫৩ জন।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিমাণ প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ১৫ হাজার ৯১১ দশমিক ১৬ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ১৫৩টি ইউনিয়নের ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর, দিঘি ও মৎস্য খামারের মাছ ভেসে যাওয়ায় প্রায় ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। দুই উপজেলায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। গতকাল বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সরকার ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মজুত রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গম উপকূলীয় অনেক ইউনিয়নে এখনো ত্রাণ পৌঁছেনি। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকা এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্রও নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাতকানিয়ার কাছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের একটি অংশ বৃহস্পতিবার থেকে পানির নিচে রয়েছে। সীমিত আকারে যান চলাচল শুরু হলেও পানি বাড়লে আবারও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়নেই বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় খানখানাবাদ, কাথারিয়া, বাহারছড়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, সরল, ছনুয়া ও গুণাগরী ইউনিয়নে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, হাজার হাজার কাঁচাঘর ধসে পড়েছে। অনেক এলাকায় টানা তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সাতকানিয়ায় সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে বাজালিয়া, কেওচিয়া, ছদাহা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, খাগরিয়া, আমিলাইশ, ঢেমশা, নলুয়া, চরতি ও পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের, বাজার ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। একই সঙ্গে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যসংকট।

এদিকে ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী, মিরসরাই ও আনোয়ারার নিম্নাঞ্চলও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে বসতঘর, কৃষিজমি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কক্সবাজারেও বন্যায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জেলার চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হওয়ায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এতে যান চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক বাড়িতে কোমর থেকে বুকসমান পানি উঠেছে। রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় বহু পরিবার রান্না করতেও পারছে না।

পর্যটক উদ্ধার :
অন্যদিকে ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ধস ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাঙ্গামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক উপত্যকায় আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ডুবে যাওয়া সড়ক নৌকায় পার করে দেওয়ার পর তাদের সড়কপথে গন্তব্যের উদ্দেশে পাঠানো হয়।
নিরাপত্তাঝুঁকি অব্যাহত থাকায় বান্দরবান জেলা প্রশাসন জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের সময় আরও তিন দিন বাড়িয়েছে। ফলে পর্যটনকেন্দ্রগুলো আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত:
চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা মোকাবেলায় উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। এ দায়িত্ব পালন করবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গত শুক্রবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতিমন্ত্রী বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে মজুত ত্রাণসামগ্রী এবং উদ্ধার কার্যক্রম মূল্যায়ন করবেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, সংস্থা, জেলা ও স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সমন্বয় নিশ্চিত করবেন।
এ ছাড়া বন্যাকবলিত এলাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রণয়ন, ত্রাণসামগ্রীর পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় কার্যক্রম তদারকি এবং বন্যা পরিস্থিতি ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে নিয়মিত সরকারকে অবহিত করার দায়িত্বও পালন করবেন তিনি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা দেবে।
যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি সভাপতি :
রোববার (১২ জুলাই) দুপুরে বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে ত্রাণসামগ্রী বিতরণকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। দুর্গত এলাকায় আমাদের উদ্যোগে মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনার পাশাপাশি খাদ্য ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।
জেলা পর্যায়ের নেতৃত্ব সার্বক্ষণিক বন্যাকবলিত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর রাখছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে মানবিকতা, সহযোগিতা ও ঐক্যের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।
এসময়  যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মাহফুজুর রহমান মাহফুজ, আহমেদ মুন্না, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেদ, সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর যুবদল নেতা মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম শহিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বিজিসি ট্রাস্ট :
বন্যাকবলিত বাঁশখালী এলাকায় বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী বিজিসিয়ানদের যৌথ উদ্যোগে প্রথম ধাপের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। সংগৃহীত ত্রাণসামগ্রী নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল দুর্গত এলাকায় বিতরণ করেন।
এ কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শুভানুধ্যায়ীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ ছিল।
উদ্যোক্তারা জানান, প্রথম ধাপের কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপের ত্রাণ বিতরণ শুক্রবার সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া এলাকার বন্যাকবলিত মানুষের জন্য পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে।
এ লক্ষ্যে এখনো তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই সহযোগিতাকারীদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দেশের সব বন্যাদুর্গত মানুষের নিরাপত্তা ও দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন। ##

পাঠক সংখ্যা০