পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘকাল ধরে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভৌগোলিক পরিচয় নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি সুনির্দিষ্ট দ্বিধা ও বিতর্ক প্রায়ই পরিলক্ষিত হয়। সম্প্রতি পাহাড়ে জন্ম ও বেড়ে ওঠার সুবাদে নিজেকে ‘পাহাড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করার পর কিছু মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও অহেতুক ট্রোলের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—ভূ-প্রাকৃতিক বিচারে জন্মসূত্রে পাহাড়ে বেড়ে ওঠা একজন বাঙালি কি নিজেকে ‘পাহাড়ি’ দাবি করতে পারেন? নাকি ‘পাহাড়ি’ শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত স্বত্ব?
এই বিতর্কের বৈজ্ঞানিক, নৃবিজ্ঞানিক, ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক ব্যাকরণ বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
নৃবিজ্ঞান (Anthropology) এবং মানব ভূগোলের (Human Geography) মৌলিক নীতি অনুযায়ী, যেকোনো মানবগোষ্ঠীর পরিচয় প্রধানত দুটি স্বতন্ত্র স্তরে বিভক্ত:
১. জাতিগত বা সাংস্কৃতিক সত্তা (Ethnic Identity): যা ভাষা, রক্তসূত্র, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত (যেমন: বাঙালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ইত্যাদি)।
২. ভূ-প্রাকৃতিক বা আঞ্চলিক পরিচয় (Geographical Identity) যা নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডে জন্ম, দীর্ঘমেয়াদী নিবাস ও বেড়ে ওঠার পরিবেশগত বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত (যেমন: পাহাড়ি, সমতলবাসী, উপকূলবাসী ইত্যাদি)।
এখানে কোনো বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। ‘পাহাড়ি’ কোনো একক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর স্বত্বাধিকারভুক্ত শব্দ নয়; এটি একটি নির্ভেজাল ভূ-প্রাকৃতিক সংস্থান। সমতলে জন্মগ্রহণকারী ও বসবাসকারী একজন চাকমা, মারমা বা ত্রিপুরা নাগরিক যদি ভৌগোলিক পরিচয়ে সমতলের অধিবাসী হতে পারেন এবং একই সাথে নিজ জাতিগত পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখতে পারেন, তবে পাহাড়ে জন্ম ও বেড়ে ওঠা একজন বাঙালি জাতিগতভাবে ‘বাঙালি’ এবং আঞ্চলিক ও ভূ-প্রাকৃতিক বিচারে ‘বাঙালি বংশোদ্ভূত পাহাড়ি’—এটাই বিজ্ঞানসম্মত সত্য।
তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যাকরণ:
আমেরিকান প্রখ্যাত নৃতাত্ত্বিক ও “কালচারাল ইকোলজি” (Cultural Ecology) তত্ত্বের জনক জুলিয়ান স্টুয়ার্ড (Julian Steward) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মানুষের ভৌগোলিক বা আঞ্চলিক পরিচয় এবং তার নৃতাত্ত্বিক বা সংস্কৃতিগত পরিচয় দুটি পৃথক মাত্রা। নির্দিষ্ট ভূ-প্রকৃতিতে দীর্ঘদিন বসবাস ও বেড়ে ওঠার ফলে মানুষের যে সামাজিক ও পরিবেশগত আত্মপরিচয় (Geo-ecological Identity) তৈরি হয়, তা তার রক্তসূত্র বা বংশগত পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না।
স্টুয়ার্ডের এই তত্ত্ব স্পষ্ট করে যে, পাহাড়ে বেড়ে ওঠা যেকোনো মানুষের পরিবেশগত পরিচয় ‘পাহাড়ি’ বা Highlander যা তার বংশগত বা রক্তসূত্রের সত্তা থেকে পুরোপুরি আলাদা।
অনুরূপভাবে, বিশ্ববিখ্যাত চীনা-আমেরিকান মানবিক ভূগোলবিদ ই-ফু তুয়ান (Yi-Fu Tuan) তাঁর “টোপোফিলিয়া” (Topophilia) বা ভূমির প্রতি মানুষের আত্মিক টানের তত্ত্বে স্থানিক পরিচয়ের সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর তত্ত্ব মতে, “স্থান” (Place) কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা জনগোষ্ঠীর একচ্ছত্র সম্পদ নয়। কোনো সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিসরে একজন মানুষের জন্ম, শৈশব এবং জীবনের অভিজ্ঞতা সেই স্থানের প্রতি তার এক ধরনের আত্মিক ও সামাজিক অধিকার (Sense of Place) তৈরি করে, যা সম্পূর্ণরূপে প্রাকৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক।
তুয়ানের এই দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করে যে, পার্বত্য খাগড়াছড়ি বা পার্বত্যাঞ্চলের মাটিতে জন্মে বেড়ে ওঠা একজন মানুষের সেই ভূমির প্রতি ভালোবাসা ও আঞ্চলিক পরিচয় শতভাগ প্রাকৃতিরীতিসিদ্ধ।
অস্থায়ী অবস্থান বনাম স্থায়ী নিবাসের অপযুক্তি:
অনলাইন বা সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই বিমানের ক্ষণিকের অবস্থান কিংবা সাময়িক অভিবাসনের সাথে স্থায়ী অস্তিত্বকে গুলিয়ে ফেলে অসংলগ্ন তুলনা টানা হয়। নৃবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রীয় আইনের প্রাথমিক জ্ঞানসম্পন্ন যে কেউ বুঝবেন, ‘অস্থায়ী অবস্থান’ (Temporary Presence) এবং ‘স্থায়ী নিবাস’ (Permanent Domicile)—এ দুটির আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক যখন কোনো সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে স্থায়ীভাবে জন্মলাভ করেন এবং জীবনযাপন পরিচালনা করেন, তখন সেই ভূখণ্ডের অধিবাসী হওয়ার প্রাকৃতিক ও সাংবিধানিক অধিকার তাঁর জন্মসূত্রেই তৈরি হয়।
সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে বাংলাদেশের বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. অনুপম সেনের বিশ্লেষণের দিকে তাকালেও স্পষ্ট হয় যে, একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের আঞ্চলিক পরিচয় নির্ধারিত হয় তার স্থায়ী বসবাস এবং জন্মসূত্রের ওপর ভিত্তি করে, কোনো গোষ্ঠীবদ্ধ একচেটিয়া মানসিকতার মাধ্যমে নয়। ভৌগোলিক বাস্তবতাকে জাতিগত চশমা দিয়ে অস্বীকার করা সমাজবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে অসংগতিপূর্ণ।
একইভাবে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান বিষয়টিকে প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করে উল্লেখ করেন যে, পাহাড় বা সমতল—যেকোনো আঞ্চলিক পরিচয় হলো একটি ভৌগোলিক সংস্থান (Geographical Location)। সমতলে যেমন বহু জাতিগোষ্ঠী একত্রে বসবাস করে “সমতলবাসী” হিসেবে পরিচিত হতে পারে, ঠিক তেমনি পার্বত্যাঞ্চলের ভৌগোলিক সীমারেখায় বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিকই আঞ্চলিক বিচারে ওই অঞ্চলের অধিবাসী।
পরিশেষে বলতে চাই, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো—সুনির্দিষ্ট যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার ঘাটতি থাকলে প্রায়শই ‘সেটেলার’ বা অন্যান্য বিদ্বেষমূলক শব্দ ব্যবহার করে মূল আলোচনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বস্তুত, অশালীন কটূক্তি বা ট্যাগিং কোনো যুক্তির বিকল্প হতে পারে না; তা বরং ব্যক্তিগত সংকীর্ণতা ও অশিক্ষারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
নৃতাত্ত্বিক জুলিয়ান স্টুয়ার্ডের “কালচারাল ইকোলজি” কিংবা ভূগোলবিদ ই-ফু তুয়ানের “টোপোফিলিয়া” ধারণার দিকে তাকালে দেখা যায়—মানুষের আঞ্চলিক ও পরিবেশগত পরিচয় এবং তার রক্তসূত্রের জাতিগত পরিচয় দুটি ভিন্ন মাত্রা। স্থান বা ভূ-প্রকৃতি কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর একচ্ছত্র রাজনৈতিক সম্পত্তি নয়। তাই নৃবিজ্ঞান, ভূগোল ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নীতি অনুযায়ী, পার্বত্য খাগড়াছড়িতে জন্ম ও বেড়ে ওঠার সুবাদে একজন বাঙালির নিজেকে ‘বাঙালি বংশোদ্ভূত পাহাড়ি’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বহন করে।
ভূ-প্রাকৃতিক সত্তা এবং জাতিগত সত্তা একটি অপরটির বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই—পাহাড়ের মাটি, হাওয়া ও পরিবেশের সাথে যার জন্ম ও স্থায়ী জীবনপ্রবাহ যুক্ত, তিনি বৈজ্ঞানিক ও আঞ্চলিক সংজ্ঞায় একজন গর্বিত পাহাড়ি।
লেখক: এ এইচ এম ফারুক
সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
তথ্যসূত্র /References:
ক। Julian H. Steward (1955). Theory of Culture Change, University of Illinois Press.
খ। Yi-Fu. Tuan (1974). Topophilia: A Study of Environmental Perception, Attitudes, and Values, Prentice-Hall.
গ। ড. অনুপম সেন (২০১৩)। বাংলাদেশ: রাষ্ট্র ও সমাজ।
ঘ। সলিমুল্লাহ খান (২০১৮)। আদমবোমা (জাতীয়তা ও ভৌগোলিক সংস্থান বিষয়ক আলোচনা)।