(প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, দ্য ডেইলি স্টার – স্লো রিডস / আনহার্ড ভয়েসেস)
ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত “A grave threat to Cox’s Bazar’s sand dunes” (কক্সবাজারের বালিয়াড়ির ওপর মারাত্মক হুমকি) শীর্ষক নিবন্ধটির সম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:
কক্সবাজার বিশ্বজুড়ে পরিচিত তার দীর্ঘ, অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্রসৈকতের জন্য। তবে সৈকত কিন্তু কোনো নিষ্প্রাণ বস্তু নয়; এটি একটি জীবন্ত ও গতিশীল উপকূলীয় ভূ-প্রাকৃতিক ব্যবস্থা (Earth System)। ভূ-টেকটোনিক পরিবর্তন, নদীর পলিপ্রবাহ, ঢেউ, জোয়ার-ভাটা, বাতাস এবং তটরেখা বরোবর প্রবাহিত স্রোতের এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মধ্য দিয়ে সহস্রাব্দ ধরে এটি টিকে রয়েছে।
১৭৯৮ সালে ফ্রান্সিস বুকানন যখন এই অঞ্চল পরিদর্শন করেছিলেন, তখন তিনি দেখে ছিলেন একটি সংকীর্ণ উপকূল—যেখানে জোয়ারের শক্তিশালী পানি উপকূলীয় পাহাড়ের পাদদেশ ছুঁয়ে যেত এবং প্রতি ৮০০ মিটার পরপর মিঠাপানির ছোট ছোট ছড়া গিয়ে সমুদ্রে মিশত। দেশীয় নোনা ঝাউ গাছ এই উপকূলকে শক্তভাবে ধরে রেখেছিল। বিগত দুই শতাব্দীতে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী ব্যবস্থার বিশাল পলি জমার মাধ্যমে কলাতলীর পশ্চিমে উপকূলরেখা প্রায় এক কিলোমিটার এগিয়ে এসেছে। অথচ আজ আমাদের এই অমূল্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে “অবকাঠামো উন্নয়ন” এবং “উপকূল সুরক্ষার” নামে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে।
সুগন্ধা সৈকতের সক্রিয় বালিয়াড়ি (স্যান্ড ডিউন)-র ওপর সরাসরি ১.২ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২৮ মিটার (৮২ ফুট) প্রশস্ত, চার লেনের হাইওয়ে এবং কংক্রিটের “শহর রক্ষা বাঁধ” নির্মাণ আমাদের পরিকল্পনা ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা, পরিবেশগত অন্ধত্ব এবং আইন-কানুন লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ দলিল। জাপানি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা (JICA)-র ৬৩.৫০ কোটি টাকার অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্প আমাদের উপকূলরেখায় স্থায়ী ক্ষত তৈরি করার পাশাপাশি একটি অস্থিতিশীল ও অবৈজ্ঞানিক প্রকৌশল নকশায় জনঅর্থের অপচয় ঘটাচ্ছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে আমাদের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যূহকে ধ্বংস করে এক তীব্র পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পথ উন্মুক্ত করবে।
চলমান বালুর ওপর বিপজ্জনক নকশা: টেকসই হওয়ার বিভ্রান্তি কক্সবাজার পৌরসভার নেতৃত্বে এই প্রকল্পের সমর্থকরা এই বিশাল কংক্রিট অবকাঠামোকে একটি “শহর রক্ষা বাঁধ” হিসেবে যুক্তি দিচ্ছেন, যা নাকি সমুদ্রের ঢেউ থেকে শহরকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন। তবে এই যুক্তি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ। নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদরা তুলে ধরেছেন যে, কক্সবাজার শহর সমুদ্রের পানি ঢুকে প্লাবিত হচ্ছে না; বরং বিদ্যমান অবকাঠামোগত বাধার কারণে বৃষ্টি ও পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি সমুদ্রে নিষ্কাশিত হতে না পেরে জলাবদ্ধতা তৈরি করছে।
সমুদ্রের সমান্তরালে একটি বিশাল কংক্রিটের দেয়াল তুললে তা শহরকে বাঁচাতে পারবে না; বরং তা শহরের প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ করে দেবে এবং পাহাড় থেকে সমুদ্রে নেমে আসা পানিকে আটকে রেখে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে।
তাছাড়া, এই চার লেনের হাইওয়ের নকশা নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। জানা গেছে, স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতামতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। জাইকা (JICA)-র শর্ত পূরণ করার উদ্দেশ্যে, যেসব বিশেষজ্ঞ সক্রিয় বালিয়াড়ির ওপর রাস্তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাদের প্রকল্প থেকে সরিয়ে দেওয়া বা বাদ দেওয়া হয়েছে।
রাস্তাটি জোয়ারের সর্বোচ্চ রেখা (High-tide line) থেকে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ ফুট দূরত্বে তৈরি করা হচ্ছে, যার ফলে এটি সরাসরি বঙ্গোপসাগরের তীব্র ঢেউ ও আক্রমণের মুখে পড়বে। অতীতেও একই ধাঁচে নকশা করা প্রকল্পগুলো নির্মমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সাবরাং-এ ভরাট করা খালের ওপর নির্মিত ২০০০ কোটি টাকার একটি ইকো-ট্যুরিজম সড়ক ২০২৫ সালের উচ্চ জোয়ারের সময় ভেঙে পড়ে।
আর্থিকভাবেও এই প্রকল্প একটি টিকটিক করতে থাকা টাইম বোমার মতো। ইতিপূর্বে মডার্ন হ্যাচারির কাছে তৈরি সৈকত সংলগ্ন সড়কগুলো সমুদ্রের আক্রমণ সহ্য করতে না পেরে ধুয়েমুছে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং সেখানে কেবল কংক্রিটের ধ্বংসাবশেষ পড়ে রয়েছে। প্রথম বড় কোনো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে যদি এই নতুন রাস্তা ধ্বংস হয়ে যায়, তবে প্রথম পর্যায়ের ৬৩.৫০ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের (যা বেল হ্যাচারি পর্যন্ত বিস্তৃত) আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা পুরোটাই সমুদ্রে ভেসে যাবে—আর জাইকার ঋণের এই ভারী বোঝাটুকুই দিনশেষে বইতে হবে বাংলাদেশের জনগণকে।
অর্থনৈতিক ঝুঁকির চেয়েও যা বেশি হতাশাজনক, তা হলো এর একটি বাস্তবসম্মত, কম খরচীয় এবং পরিবেশগতভাবে কম ক্ষতিকর বিকল্প বিদ্যমান ছিল। কলাতলীর পেছনে থাকা বর্তমান রাস্তাটিকে সম্প্রসারণ করা যেত, বিশেষ করে সম্প্রতি বাতিল হয়ে সরকারের খাস খতিয়ানে ফেরত আসা জমি ব্যবহার করেই তা সম্ভব ছিল। তবে কেন এমন একটি ব্যবহারিক বিকল্পকে উপেক্ষা করে সক্রিয় সৈকতের ওপর একটি ব্যয়বহুল এবং উচ্চ ঝুঁকির কংক্রিট জবরদখলকে বেছে নেওয়া হলো?
প্রকৃতির প্রতিরক্ষা ঢাল ভেঙে ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশ হত্যা এই নির্মাণের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি (ডেইল) এবং দেশীয় উদ্ভিদের নির্মম বিনাশ। এই বালিয়াড়িগুলো কিন্তু মাটির কোনো নিশ্চল স্তূপ নয়; এরা হলো উপকূলরেখার প্রাকৃতিক বর্ম। ঘূর্ণিঝড় ও বর্ষার জলোচ্ছ্বাসের সময় এই বালিয়াড়িগুলো ঢেউয়ের আঘাত শোষণ করে এবং সৈকতকে ধরে রাখে। এরা একটি গতিশীল ও স্ব-নিরাময়কারী প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
ইতোমধ্যেই সুগন্ধা সৈকতের ১০ থেকে ১২টি বিশাল বালিয়াড়ি (প্রতিটি ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু) হেভি এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে সমতল করে ফেলা হয়েছে। সাগরলতার মতো গভীর মূলের দেশীয় উদ্ভিদ—যা আলগা বালুকে শক্ত করে ধরে রেখে সৈকতকে স্থায়িত্ব দেয়—সেগুলোকে উপড়ে ফেলে ভারী মাটি ও কংক্রিটের নিচে চাপা দেওয়া হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবেই দেখা গেছে, যখনই আমরা গভীর মূলের দেশীয় উদ্ভিদ বদলে অগভীর মূলের বিদেশী প্রজাতি (যেমন অস্ট্রেলেয়ান ঝাউ) দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছি, তখনই বালিয়াড়ি শক্ত হয়ে ধস নেমেছে এবং ভাঙন ত্বরান্বিত হয়েছে। কারণ তাদের অগভীর মূল বালুর গভীর স্তরকে ধরে রাখতে পারেনি। আর এই নতুন প্রকল্প তো একধাপ এগিয়ে একটি জীবন্ত উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের জায়গায় বসিয়ে দিচ্ছে শক্ত কংক্রিটের অবকাঠামো!
এর তাৎক্ষণিক শিকার হচ্ছে সৈকতের সংবেদনশীল প্রাণীকূল। সমতল করা এই বালিয়াড়িগুলো ছিল লাল কাঁকড়ার সমৃদ্ধ আবাসস্থল এবং বিপন্ন অলিব রিডলি সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বালিয়াড়ি বুজিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আমরা মূলত কক্সবাজার থেকে এই প্রজাতিগুলোকে চিরতরে মুছে দিচ্ছি।
তাছাড়া সমুদ্রসৈকত একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও পরিবর্তনশীল ব্যবস্থা। টিকে থাকতে হলে এর সাথে প্রকৃতির সংযোগ বজায় রাখা আবশ্যক। পাহাড় থেকে সমুদ্রের দিকে পানি প্রবাহিত হতে হবে এবং বাতাস ও জোয়ারের সাথে বালুকে অবাধে চলাচলের সুযোগ দিতে হবে। একটি ২৮ মিটার চওড়া কংক্রিটের হাইওয়ে, সাথে পার্কিং লট, সিঁড়ি ও র্যাম্প বানিয়ে এই সংযোগ কেটে দিলে সৈকতের দম বন্ধ হয়ে যাবে। বছরে যে ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক এখানে একটি শান্ত ও নিবিড় সৈকতের অভিজ্ঞতা নিতে আসেন, তারা এসে পাবেন যানজটে ঠাসা কংক্রিটের স্ট্রিপ আর ব্যস্ত হাইওয়ে মোড়—যেখানে পানিতে নামতে গিয়েও গাড়ি বাঁচিয়ে চলতে হবে।
এটি আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার (International best practices) একদম বিপরীত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মুখোমুখি হয়ে সৈকত সুরক্ষা ও উদ্ভিদের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধারে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছে। আমাদের প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কায় কঠোর আইনি বিধিমালা রয়েছে, যা নির্ধারণ করে দেয় সৈকত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে উপকূল থেকে ঠিক কত দূরে অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে। আর কক্সবাজারে আমরা সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে আমাদের প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যূহকেই ভেঙে চুরমার করছি।
সাবরাং বনাম সমিতি পাড়া: উপকূলীয় সহনশীলতার চরম শিক্ষা সুগন্ধা-কলাতলী প্রকল্পের গলদ বুঝতে আমাদের নিজেদের উপকূলের দুটি বিপরীতমুখী উদাহরণ দেখাই যথেষ্ট: সাবরাং এবং সমিতি পাড়া। এই দুটি উদাহরণ আমাদের সামনে উন্নয়নের দুটি ভিন্ন মডেল তুলে ধরে—একটি প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, অন্যটি প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে কাজ করে।
সাবরাং ইকো ট্যুরিজম পার্ক: প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে উন্নয়নের পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার এক জলন্ত উদাহরণ সাবরাং। নাফ নদীর পরিবর্তনশীল মোহনায় অবস্থিত সাবরাং-এর প্রাকৃতিক সহনশীলতা রক্ষা পেত জোয়ার-ভাটা, ঢেউ এবং পলির চলাচলের মাধ্যমে। অথচ ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিকাশকারীরা বিশাল এলাকা বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলে। দামী ট্যুরিজম অবকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ জোয়ারের খাল ও জলাভূমিগুলো বুজিয়ে দেয়। ২০২৪ সাল নাগাদ এই প্রকল্পে সরকারি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা। ফলাফল—পলি ও পানির স্বাভাবিক পথ অবরুদ্ধ হয়ে বাস্তুতন্ত্রের দম আটকে যায়।
এর চরম মাশুল দিতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ২০২৫ সালের উচ্চ জোয়ারের সময় সাবরাং ইকো ট্যুরিজম পার্কের নবনির্মিত রাস্তাটি ধসে ভেতরের ফাঁপা, পানিতে জমে থাকা সেই পুরনো বুজিয়ে দেওয়া খালটি বেরিয়ে পড়ে। এই ধস একটি পরম সত্য প্রকাশ করে দিয়েছে—কংক্রিট দিয়ে প্রাকৃতিক মোহনাকে সহজে জয় করা যায় না। অবকাঠামো যখন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে, তখন সেই ভাঙন হয়ে ওঠে স্থায়ী, ব্যয়বহুল ও বিপজ্জনক।
সমিতি পাড়া: এর বিপরীতে, সমিতি পাড়া দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে মানব বসতি ও বাস্তুতন্ত্র পাশাপাশি টিকে থাকতে পারে। ১৯৬০ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের জন্য খাস জমিতে প্রতিষ্ঠিত সমিতি পাড়া আজ একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। তবুও, উপকূলের অন্যান্য অংশ যেখানে ভাঙনের মুখে পড়েছে, সেখানে সমিতি পাড়ার সৈকত উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে! ‘ল্যান্ডস্যাট’ কৃত্রিম উপগ্রহের চিত্রে দেখা যায়, ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এখানে ১৯.৪ লাখ বর্গমিটার এবং ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আরও ৮.৯ লাখ বর্গমিটার নতুন জমি জেগে উঠেছে (Accretion)—যা সমুদ্রের দিকে তটরেখাকে ১.২ কিলোমিটার এগিয়ে নিয়ে গেছে।
সমিতি পাড়ার এই সাফল্য এবং সাবরাং-এর ব্যর্থতার কারণ কী? উত্তর লুকিয়ে আছে এর অবকাঠামোগত বিন্যাসে:
১. সমিতি পাড়ার প্রধান সড়কগুলো পূর্ব- পশ্চিমে তৈরি হয়েছিল, যা জমি ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহের সমান্তরাল।
২. এর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্মুক্ত ছিল, ফলে পাহাড় থেকে আসা মিষ্টি পানি এবং পলিবাহী জোয়ারের পানি কোনো বাধা ছাড়াই যাতায়াত করতে পারত।
৩. পলি ও পানির সংযোগ অক্ষুণ্ণ থাকায় সৈকত তার নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতাবলে পলি ধরে রেখে সমুদ্রের দিকে প্রসারিত হতে পেরেছে।
পার্থক্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট। সাবরাং ২,০০০ কোটি টাকা খরচ করে একটি শক্ত দেয়াল তুলে প্রকৃতির পথকে রুদ্ধ করতে চেয়েছিল, যার পরিণতি ছিল মারাত্মক ব্যর্থতা। আর সমিতি পাড়া প্রকৃতির পথকে বাধা না দিয়ে সৈকতকে স্বাভাবিকভাবে বড় হতে দিয়েছে, যা বিনা খরচে এলাকাকে সুরক্ষা দিয়েছে। সুগন্ধায় চার লেনের বিশাল কংক্রিট হাইওয়ে বানিয়ে আমরা আসলে টেকসই সমিতি পাড়ার মডেল ছেড়ে ধ্বংসাত্মক সাবরাং-এর পথকেই বেছে নিচ্ছি।
সুরক্ষিত ভূমিতে আইনি লঙ্ঘন ও অরাজকতা
এই প্রকল্পের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো—যে কর্তৃপক্ষ পরিবেশ ও সংবিধান রক্ষায় শপথবদ্ধ, তাদের দ্বারাই আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
১৯৯৯ সালে এই অনন্য বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক হুমকির কথা বিবেচনা করে সরকার কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলের ১০,৪৬৫ হেক্টর এলাকাকে ‘প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা’ (Ecologically Critical Area – ECA) হিসেবে ঘোষণা করে। ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন’ এবং ECA বিধিমালা অনুযায়ী, মাটি, পানি বা ভূমির প্রাকৃতিক অবস্থা পরিবর্তন করা বা উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই একটি সক্রিয় বালিয়াড়ির ওপর চার লেনের কংক্রিট হাইওয়ে নির্মাণ করা সরাসরি এক বেআইনি কর্মকাণ্ড।
তা সত্ত্বেও পরিবেশ অধিদপ্তরের (DoE) পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই এই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। পৌরসভা দাবি করছে যে তাদের ছাড়পত্র আছে, কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর স্পষ্ট করেছে যে তারা কেবল বিদ্যমান একটি ছোট রাস্তার ৯ মিটার প্রশস্ত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের অনুমোদন দিয়েছিল। একটি সাধারণ মেরামতের পারমিট ব্যবহার করে সুরক্ষিত সৈকতের বুক চিরে ২৮ মিটার চওড়া হাইওয়ে বুলডোজার দিয়ে তৈরি করা স্পষ্টতই এক প্রতারণামূলক ও বেআইনি কাজ।
তদুপরি, এই নির্মাণ সরাসরি বিচারবিভাগের অবমাননা। ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর হাইকোর্ট ১২০ কিলোমিটার সৈকত থেকে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল—পৌরসভা এলাকায় উচ্চ জোয়ারের সীমা (High-tide line) থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে কোনো ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। এমনকি সরকারের নিজেদের করা ‘কক্সবাজার মাস্টার প্ল্যান ২০১৩’-তেও ইন্টারটাইডাল জোন থেকে প্রথম ৩০০ মিটারকে কঠোর “নো ডেভেলপমেন্ট জোন” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ বর্তমান নির্মাণকাজটি সমুদ্রের পানি থেকে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ ফুট (১২-১৫ মিটার) দূরে ঘটছে—যা হাইকোর্টের রায় এবং মাস্টার প্ল্যান উভয়েরই প্রকাশ্য ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ লঙ্ঘন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED)-এর পূর্বেও এমন অনেক প্রকল্প করার ইতিহাস রয়েছে যা পরিবেশগত বিধিমালা লঙ্ঘনের গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ইতিপূর্বে টেকনাফের ঐতিহ্যবাহী ‘শীলখালী গর্জন বন’-এর ভেতর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েছিল। আজ বিশ্বের দীর্ঘতম বালুকাময় সৈকতে আবারও সেই একই বিপজ্জনক খেলা খেলা হচ্ছে। উপকূল রক্ষা করার পরিবর্তে এই সংস্থাগুলো নতুন এই চার লেনের হাইওয়ে প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ধ্বংস করতে চাইছে—যেখানে পরিবেশের টিকে থাকার চেয়ে কংক্রিট অবকাঠামোকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
এ ধরনের প্রকল্পের অনুমতি দিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিও লঙ্ঘন করছে। ১৯৯২ সালের ‘বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি কনভেনশন’ (CBD) এবং ২০১৫ সালের ‘প্যারিস চুক্তি’-র একজন গর্বিত স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা নিজস্ব অনন্য আবাসস্থল রক্ষা করবে, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি রোধ করবে এবং জলবায়ু-সহনশীল প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে সমাধান বাস্তবায়ন করবে। এই আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো কেবল শোভাবর্ধক স্বাক্ষর নয়; এগুলো বাধ্যতামূলক ফ্রেমওয়ার্ক। এই আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিগুলোর ওপর ভিত্তি করেই আমাদের উপকূলের ভঙ্গুর সুরক্ষাব্যূহ ধ্বংস না করে কীভাবে পরিবেশগত বিধিমালার সাথে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো উন্নয়ন করা যায়, তা নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে।
শুভবুদ্ধির উদয় ও পুনরুদ্ধারের আহ্বান উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে প্রায়শই মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বিপরীতমুখী বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু যে ভূ-প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর আমাদের জীবন, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি নির্ভরশীল, তাকে ধ্বংস করে কোনো প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না। যদি আমরা বালিয়াড়ি ধ্বংস করে ফেলি, তবে সমুদ্র এসে জমি গ্রাস করবে, পর্যটকরা আসা বন্ধ করে দেবে এবং পরবর্তী ঝড়েই জনঅর্থ সমুদ্রে ভেসে যাবে।
আমাদের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্রসৈকতের জন্য আমাদের সমন্বিত কোনো ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (Management plan) নেই। একটি একক বৈজ্ঞানিক কাঠামোর অধীনে এই অমূল্য বাস্তুতন্ত্র পরিচালনা করার বদলে একে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে খণ্ড খণ্ড করে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে করপোরেট পর্যটন ও মেগা-বিল্ডিং প্রকল্পগুলো সৈকতের সংবেদনশীল পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে তোয়াক্কাই করছে না। বন্যাপ্রবণ এলাকায় বিশাল হোটেল নির্মাণ থেকে শুরু করে এই নতুন চার লেনের হাইওয়ে—স্বল্পমেয়াদী ব্যবসায়িক লাভের এই প্রতিযোগিতা আমাদের উপকূলের বিনিময়েই ঘটে চলেছে।
তবে রাষ্ট্র কেবল নীরব দর্শক হয়ে এই ধ্বংসলীলা দেখতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী, নতুন প্রজন্মের জন্য সমুদ্র উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের জীবন ও অখণ্ডতা রক্ষা করতে রাষ্ট্র বাধ্য। সংবিধানে ১৮এ (18A) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবে এবং জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা প্রদান করবে। এটি কোনো সাধারণ নীতিগত পছন্দ নয়; এটি একটি বাধ্যতামূলক সাংবিধানিক দায়িত্ব। আন্তঃপ্রজন্মীয় ইক্যুইটি (Intergenerational equity) দাবি করে যে, আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষয়ে যাওয়া কোনো নিওন-কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ নয়, বরং একটি জীবন্ত উপকূলরেখা রেখে যাব।
অবিলম্বে সুগন্ধা-কলাতলী সৈকত সড়ক নির্মাণ বন্ধ করতে হবে, সমতল করা বালিয়াড়ি পুনর্গঠন করতে হবে এবং দেশীয় সাগরলতাসহ অন্যান্য উপকূলীয় উদ্ভিদ পুনরায় রোপণ করতে হবে।
কক্সবাজারকে পরিবেশগতভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত কংক্রিটের স্ট্রিপে পরিণত না করে একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক বিস্ময় হিসেবে রক্ষা করা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক পরম দায়বদ্ধতা।
লেখক পরিচিতি: ড. আদিল মোহাম্মদ খান: নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (IPD) এবং অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
আমিরুল রাজীব ও নাইম উল হাসান: পরিবেশকর্মী ও সমন্বয়ক, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন।
খন্দকার নিয়াজ রহমান: নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ।
পাভেল পার্থ: পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ গবেষক এবং পরিচালক, বারসিক (BARCIK)।
ড. শায়র গফুর: অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, বুয়েট।
সুমাইয়া রহমান: স্থপতি।