পাহাড়ি-বাঙালি ঐক্য, সমান অধিকার ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষায় প্রয়োজন বাস্তবসম্মত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চল। পাহাড়, বন, নদী, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, পর্যটন ও সম্ভাবনাময় খনিজসম্পদ এ অঞ্চলকে জাতীয় অর্থনীতি এবং কৌশলগত উন্নয়নের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংঘাত, অবিশ্বাস, ভূমিবিরোধ, নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে এ অঞ্চলের বিপুল সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংঘাতের মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি মানুষকে।
প্রশ্ন হচ্ছে—পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ কি শান্তিতে বসবাস, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নয়নের সমান সুযোগ পাবে না? পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও আস্থার পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা কি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব নয়?
খনিজসম্পদের সম্ভাবনা: প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান:
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূগর্ভে মূল্যবান খনিজসম্পদ রয়েছে কি না, থাকলে তার ধরন, পরিমাণ ও অর্থনৈতিক ব্যবহারযোগ্যতা কতটুকু—এসব প্রশ্নের উত্তর আবেগ কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে নয়, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
বিশ্বে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি ও আধুনিক প্রযুক্তিশিল্পে বিভিন্ন খনিজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উপযোগী বিরল খনিজের বড় মজুত রয়েছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ভূতাত্ত্বিক তথ্য ও গবেষণালব্ধ প্রমাণ প্রয়োজন।
সরকারের উচিত পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের অধিকার নিশ্চিত করে একটি স্বচ্ছ ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও খনিজসম্পদ মূল্যায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা। সম্ভাবনা পাওয়া গেলে তার অর্থনৈতিক উপযোগিতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় মানুষের সম্মতি ও স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।
জাতীয় সম্পদের অনুসন্ধান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যেন কোনো ধরনের গোপনীয়তা, অনিয়ম কিংবা স্বার্থের সংঘাত তৈরি না হয়, সে জন্য প্রয়োজন জবাবদিহি ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞ তদারকি।
পরিচয়ের রাজনীতি নয়, চাই অধিকার ও সম্প্রীতি:
পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত পরিচয়, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, ভূমির অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব প্রশ্নকে উপেক্ষা করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। একইভাবে পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভাজন, বিদ্বেষ কিংবা সহিংসতাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হলে তা পুরো দেশের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত চুক্তি ও বিধানের আলোকে সব নাগরিকের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি বাঙালি অধিবাসীদের বৈধ অধিকার ও নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে অস্বীকার করা কিংবা কোনো জাতিগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করা সমস্যার সমাধান নয়। বরং পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষ ও বৈষম্য দূর করে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম লক্ষ্য।
বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ: প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত:
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাতকে ঘিরে বিদেশি অর্থায়ন, অস্ত্র সরবরাহ, প্রশিক্ষণ কিংবা ভূরাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ ও আলোচনা সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আবেগনির্ভর প্রচার নয়, প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ।
কোনো বিদেশি রাষ্ট্র, সংস্থা কিংবা ব্যক্তি যদি অবৈধভাবে অস্ত্র সরবরাহ, সহিংসতায় অর্থায়ন, মানবপাচার, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি বা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ মানবিক সহায়তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতাকে অযৌক্তিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা উচিত নয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা, অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং বিদেশি প্রভাবের অভিযোগগুলো স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা। প্রমাণ ছাড়া কোনো জনগোষ্ঠী, সংগঠন বা বিদেশি রাষ্ট্রকে দায়ী করলে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শান্তিচুক্তি ও ভূমিবিরোধের বাস্তবসম্মত সমাধান:
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকারিতা এবং আঞ্চলিক পরিষদগুলোর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এসব বিষয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনি স্বচ্ছতা ও অংশীজনদের কার্যকর অংশগ্রহণ জরুরি।
সরকারের উচিত চুক্তির বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করে যেসব ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করা। প্রয়োজন হলে সাংবিধানিক ও আইনগত কাঠামোর মধ্যে থেকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে সংস্কার ও সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।
ভূমি কমিশনের কার্যক্রম গতিশীল করা, নথিপত্র যাচাই, বিরোধ নিষ্পত্তিতে নিরপেক্ষতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ভূমি দখল, জবরদখল কিংবা বেআইনি উচ্ছেদের অভিযোগের তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিক্ষা, চাকরি, সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো ধরনের বৈষম্য বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেগুলোও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব, যোগ্যতা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং সাংবিধানিক সমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই হবে টেকসই সমাধানের পথ।
অস্ত্রের বদলে সংলাপ, সংঘাতের বদলে উন্নয়ন:
পার্বত্য অঞ্চলে যেকোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক ও মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে নিরপরাধ মানুষের অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
নিরাপত্তা বাহিনী ও জনপ্রশাসনকে আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে। পাশাপাশি মানবাধিকার, জবাবদিহি, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
পাহাড়ি ও বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত সংলাপ, স্থানীয় পর্যায়ে শান্তি কমিটি, বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং সংঘাতপ্রবণ এলাকায় আস্থাবর্ধক উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। তরুণদের শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, খেলাধুলা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে তারা সহিংসতার পরিবর্তে সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যেতে পারে।
পর্যটন, কৃষি ও প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা:
পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি, ফল উৎপাদন, বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত না করে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না।
প্রাকৃতিক পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষা করে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি, বাজারসংযোগ, সংরক্ষণব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। তরুণদের জন্য কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
খনিজসম্পদের সম্ভাবনা থাকলে তার সুফল যেন কেবল কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়। জাতীয় স্বার্থ, স্থানীয় মানুষের অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ন্যায্য অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
এখনই প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ:
পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তির জন্য কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি—
১. শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার।
২. ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তিতে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
৩. অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মাদক ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ।
৪. বিদেশি অর্থায়ন ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা।
৫. পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও বৈধ অধিকার নিশ্চিত করা।
৬. খনিজসম্পদের সম্ভাবনা যাচাইয়ে বৈজ্ঞানিক জরিপ এবং পরিবেশগত মূল্যায়ন পরিচালনা।
৭. শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, কৃষি, পর্যটন ও প্রযুক্তিতে সমতাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
৮. তরুণ সমাজকে সহিংসতা থেকে দূরে রেখে শিক্ষা, দক্ষতা ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা।
উপসংহার: পাহাড় সবার, শান্তি সবার অধিকার:
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ সংঘাত, বিভাজন কিংবা পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষের ওপর নির্ভর করতে পারে না। এ অঞ্চলের স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আইনের শাসন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।
কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেমন অনুচিত, তেমনি পরিচয়, সংস্কৃতি ও ন্যায্য অধিকার নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে অবজ্ঞা করাও সমাধানের পথ নয়। পাহাড়ি ও বাঙালি—সব সম্প্রদায়ের শান্তিপ্রিয় মানুষকে বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে সহাবস্থান ও উন্নয়নের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
আমরা চাই—পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্রের পরিবর্তে সংলাপ, বিদ্বেষের পরিবর্তে সম্প্রীতি, দখলের পরিবর্তে ন্যায়বিচার এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগের পরিবর্তে সত্যনিষ্ঠ তদন্ত প্রতিষ্ঠিত হোক। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশ ও মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকুক।
পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতিই হোক শান্তির ভিত্তি। পরিচয় যার যার, অধিকার সবার; বাংলাদেশ আমাদের সবার।
লেখক পরিচিতি : প্রাবন্ধিক ও পরিচালক — সিসিআরএসবিডি ।