অনলাইন আর্থিকণার অভিযোগে ছয়জন গ্রেপ্তার; মামলায় অজ্ঞাত ২৫০–৩০০ জনকে আসামি। রিসোর্টে মিলেছে বিপুল ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম

কক্সবাজারে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিকদের একটি বড় দলের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পাশাপাশি আরও চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, অভিযানের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে চক্রটির অনেক সদস্য কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়েছেন। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
রামু থানার পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার ছয়জনকে শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলায় নাম থাকা অন্য চারজন হলেন—ঝান ইউয়ান ফান ওরফে বাবর আলী, পাই লেডিং, উ ঝিপিং ও জিয়ান ঝাং।
রিসোর্টে কম্পিউটার ল্যাব, উদ্ধার প্রায় দুই হাজার আইফোন:
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৬ আগস্ট রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে অভিযান চালানো হয়। গোয়েন্দা অনুসন্ধানে সেখানে একটি বড় হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব ও সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ তৈরির তথ্য পাওয়া যায়।
অভিযানে ওই রিসোর্টের একটি কক্ষ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস ও ২৪টি কানেকশন বোর্ডসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
এ ছাড়া চীনা পুলিশের র‍্যাংক ব্যাজ, পুলিশ লোগোযুক্ত টাই এবং চীনের জাতীয় পতাকাও পাওয়ার কথা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযানের পর চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এপ্রিল থেকেই রিসোর্ট ভাড়া নেওয়ার তথ্য:
পুলিশের এজাহার অনুযায়ী, চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিকদের অনেকে ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’ নিয়ে ১ মার্চ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। গোয়েন্দা অনুসন্ধানে তাদের একটি অংশ এপ্রিল থেকে কক্সবাজারের কয়েকটি রিসোর্ট ভাড়া নিতে শুরু করার তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, বিদেশি নাগরিকদের কেউ কেউ বাংলাদেশে নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার কথা বলে রিসোর্ট ভাড়া নিয়েছিলেন। তবে তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে ওই নামে কোনো নির্মাণ কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে পুলিশের দাবি।
অভিযানের পর বিভিন্ন হোটেলে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ
পুলিশের দাবি, হিমছড়ির রিসোর্টে অভিযান চালানোর পর দলের অনেক সদস্য সেখান থেকে পালিয়ে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান নেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অনুসন্ধানেও শহরের অন্তত তিনটি হোটেলে সাম্প্রতিক সময়ে চীনা নাগরিকদের দলবদ্ধভাবে অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে।
সুগন্ধার হোটেল রয়েল পার্ল কর্তৃপক্ষের দাবি, গত এক মাসে সেখানে অন্তত ২০ জন চীনা নাগরিক অবস্থান করেছেন। তাদের মধ্যে সাতজনের একটি দল ২৭ আগস্ট হোটেলে উঠে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করে।
অন্যদিকে হোটেল স্যান্ড সিটি কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৫ আগস্ট প্রায় ২০ জনের একটি দল সেখানে আসে। তারা একদিন অবস্থান করার পর অন্যত্র চলে যায়।
কক্সবাজারের হোটেল সি-প্যালেসেও ২৬ আগস্ট চীনা নাগরিকদের একটি দল ওঠে। ওই দলের ছয়জনকেই পরে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তবে বিভিন্ন হোটেলে অবস্থানকারী প্রত্যেক চীনা বা তাইওয়ানি নাগরিক একই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
অভিযোগের কেন্দ্রে অনলাইন আর্থিক প্রতারণা:
পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে এই দলের বিরুদ্ধে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, ভুয়া প্রোফাইল এবং ক্লোন বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের লোগো ব্যবহার করে প্রতারণা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে পুলিশ নিজেই বলছে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা প্রয়োজন। ফলে কীভাবে প্রতারণা করা হয়েছে, কারা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কিংবা কত টাকার লেনদেন হয়েছে—এসব বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তদন্ত বাড়ছে, নজরদারিতে কক্সবাজারের হোটেল-রিসোর্ট
ছয়জন গ্রেপ্তারের পরও অভিযান থামেনি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে অবস্থান নেওয়া সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই চলছে।
একই সঙ্গে মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করায় তদন্তের পরিধিও আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন—রিসোর্টগুলোতে অবস্থানকারী বড় দলটির কতজন অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে জড়িত এবং তাদের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত পরিধি কতটা।
তদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলেই এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মিলবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পাঠক সংখ্যা৫১