পার্বত্য চট্টগ্রামের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে যখনই আলোচনা হয়, তখন একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে, এই অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গ্রুপগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী? তারা কি রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পথ বেছে নিতে চায়, নাকি অস্ত্র, প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং গত কয়েক দশকের সামগ্রিক বাস্তবতা, সংঘাতের ধরন এবং এর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

যেকোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে বোঝার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক বিষয় বিবেচনা করতে হয়। তাদের কর্মকাণ্ড কি রাজনৈতিক দাবিকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, নাকি সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করে অস্ত্রনির্ভর একটি প্রভাব বলয় বজায় রাখছে? কারণ ইতিহাস বলছে, যখন কোনো অঞ্চলে অস্ত্র রাজনৈতিক আলোচনার জায়গা দখল করে নেয়, তখন সাধারণ মানুষের স্বার্থ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত সহিংস ঘটনা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে দেখা যায়। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তেমনি স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনও ব্যাহত হয়। কৃষক জমিতে যেতে ভয় পান, ব্যবসায়ী বিনিয়োগে অনিশ্চয়তায় ভোগেন, শিক্ষার্থী নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বিগ্ন থাকে। অর্থাৎ সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সেই মানুষ, যারা কোনো সংঘাতের পক্ষ নয়।
অনুসন্ধানী দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, যদি কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ হয়, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, উন্মুক্ত মতপ্রকাশ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি ঝোঁক বাড়ার কথা। কিন্তু যদি সংঘাত, অস্ত্রের প্রদর্শন এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই দীর্ঘদিন ধরে প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে থেকে যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই কর্মকাণ্ডের চূড়ান্ত লাভ কার হচ্ছে?
আরও একটি বাস্তবতা হলো, যেখানে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় থাকে, সেখানে প্রায়ই অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এই প্রতিযোগিতা আদর্শগত হতে পারে, আবার প্রভাব বিস্তার বা সংগঠনগত আধিপত্য নিয়েও হতে পারে। ফলে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু অনেক সময় সাধারণ মানুষের সমস্যা থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে এসে দাঁড়ায়। এতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের চেয়ে অস্ত্রের প্রভাবই বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকরা প্রায়ই বলেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কোনো অঞ্চলের অর্থনীতিকে নীরবে দুর্বল করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ ও পর্যটন সম্ভাবনাময় এলাকায় নিরাপত্তা-সংকট বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, কর্মসংস্থান সীমিত করে এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকে জটিল করে তোলে। অর্থাৎ সংঘাত যত দীর্ঘ হয়, উন্নয়নের সুযোগ তত সংকুচিত হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আজকের তরুণ প্রজন্ম কী চায়? তারা কি অস্ত্র হাতে ভবিষ্যৎ গড়তে চায়, নাকি শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা, সরকারি চাকরি এবং আধুনিক জীবনের সুযোগকে কাজে লাগাতে চায়? বাস্তবতা বলছে, অধিকাংশ তরুণই শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশে নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ খোঁজেন। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত সেই সুযোগকে সীমিত করে দেয়।
এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইনের শাসন নিশ্চিত করা, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, উন্নয়ন কার্যক্রমে সকল জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং বৈধ রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি, এসবই একটি স্থায়ী সমাধানের অংশ। একই সঙ্গে যেকোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও প্রশ্ন থেকে যায়, তারা কি এই রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামোর ভেতরে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে প্রস্তুত, নাকি অস্ত্রকেই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ধরে রাখতে চায়?
একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা প্রয়োজন, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের কর্মকাণ্ডের দায় পুরো একটি জাতিগোষ্ঠীর ওপর বর্তায় না। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন চান। তাই বিচ্ছিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কোনো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সামগ্রিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বাস্তবসম্মত নয়।
সবশেষে প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে, “পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী সশস্ত্র গ্রুপ কোন পথে হাঁটতে চায়?” যদি তাদের লক্ষ্য সত্যিই জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ হয়, তাহলে অস্ত্রের পরিবর্তে সংলাপ, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পথই হবে সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই বিকল্প। আর যদি সংঘাত, ভয় এবং অস্ত্রনির্ভর প্রভাব বজায় রাখাই অগ্রাধিকার হয়, তাহলে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ এবং পুরো অঞ্চলের উন্নয়নের সম্ভাবনা।
ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট, সংঘাত সাময়িকভাবে প্রভাব তৈরি করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা কখনোই অস্ত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎও নির্ভর করবে এই প্রশ্নের ওপর, এ অঞ্চল কি সংঘাতের চক্রে আবদ্ধ থাকবে, নাকি আইনের শাসন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে?

লেখক: এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক, লেখক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

পাঠক সংখ্যা১৬
Share
f x w t p