বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার টেকসই সমাধানে সমন্বিত, কম খরচের ও স্থানীয়ভাবে পরিচালনাযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। একই সঙ্গে বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদ, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাপার উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও টেকসই সমাধানের রূপরেখা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়।
বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে সেমিনার সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও বাপার জীবন সদস্য ড. নাসির উদ্দীন খান। স্বাগত বক্তব্য দেন বাপার সহ-সভাপতি মহিদুল হক খান।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট পানি বিজ্ঞানী ও বাপার সহ-সভাপতি অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান এবং ক্যাবের প্রধান গবেষক প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া।
মূল প্রবন্ধে ড. নাসির উদ্দীন খান বলেন, ‘বর্জ্যকে আর বোঝা হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং বাংলাদেশের জন্য এটিকে সম্পদ, শক্তি ও অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করা উচিত।’ তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মূলত ‘Collect–Transport–Dump’ নির্ভর। ফলে বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার, সম্পদ পুনরুদ্ধার ও জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উন্মুক্ত স্থান, জলাভূমি ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ায় মিথেন নির্গমন, নদী ও জলাশয় দূষণ, নদীর তলদেশ ভরাট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, ডেঙ্গু ও অন্যান্য জনস্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে নগরভূমির অপচয়, পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ, জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও সম্ভাব্য রাজস্ব হারানোর মতো অর্থনৈতিক ক্ষতিও হচ্ছে।
ড. নাসির উদ্দীন খান বাংলাদেশের বাস্তবতায় Biogas/RDF প্রযুক্তিকে অত্যন্ত উপযোগী, Landfill-কে অবশিষ্ট বর্জ্যের জন্য মাঝারি থেকে কম উপযোগী, Gasification-কে কম উপযোগী এবং Plasma Pyrolysis-কে খুবই কম উপযোগী বলে উল্লেখ করেন। সহজ প্রযুক্তি, দেশীয় বিনিয়োগ ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, ইউরোপের সলিড ওয়েস্ট ও বাংলাদেশের সলিড ওয়েস্টের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ বলেন, ঢাকা শহরের অনেক বাসস্ট্যান্ড বর্জ্য ডাম্পিংয়ের ওপর নির্মিত হয়েছে। সেকেন্ডারি ডাম্পিং এলাকায় বৃষ্টির পানি প্রবেশ বন্ধ করা গেলে সেখানকার বর্জ্য থেকে ভালো জ্বালানি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনগুলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহের ফি আদায় করতে পারলে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করে এর বাজার সৃষ্টি করা গেলে জৈব সারের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুবিধাও পাওয়া সম্ভব।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও গবেষণা ও সমীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান বলেন, কঠিন বর্জ্যের কারণে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও আন্তঃসংযোগগুলো সার্বক্ষণিক পরিষ্কার রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ প্রকল্প চালুর প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আসবে এবং প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্যাবের প্রধান গবেষক প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া বলেন, নতুন কোনো পণ্য বা প্রকল্প বাজারে আনার আগে তা থেকে ভোক্তা ও সাধারণ মানুষ কী সুবিধা পাবে, তা বিবেচনা করা উচিত। জনগণের কল্যাণে আসে—এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে বাপার সহ-সভাপতি মহিদুল হক খান দেশের বর্জ্যের ধরন, পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরির দাবি জানান।
সেমিনারে বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উপযুক্ত স্থান, জলাভূমি ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ায় পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার টেকসই সমাধানে বাপার পক্ষ থেকে ৬ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন। সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়, পুনর্ব্যবহার, সম্পদ ও জ্বালানি উৎপাদন এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সেমিনারে বাপার কোষাধ্যক্ষ আমিনুর রসুল, যুগ্ম সম্পাদক ড. হালিম দাদ খান, হুমায়ুন কবির সুমন ও জাভেদ জাহান, নির্বাহী সদস্য অ্যাডভোকেট পারভীন আক্তার, মোনছেফা তৃপ্তি, ফাহমিদা নাজনীনসহ সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও জাতীয় কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

পাঠক সংখ্যা৩৬