২য় পর্ব : বাউল দর্শন, জীবনসংগ্রাম ও আল্লা-নবী-ওলি স্মরণ।
বাউল গানের ধারায়ও শাহ আবদুল করিম একজন জনপ্রিয় শিল্পী। গানের জগতে তাঁর উন্মেষ-বিকাশের যে ধারাবাহিকতা বা পরিক্রমা তাকে অভিযাত্রাই বলা সমীচীন। জীবন ও সংগীত-সাধনায় নানা ঘাত-প্রতিঘাত, ঝড়-ঝঞ্ঝা, বহুবিধ প্রতিকূলতাকে ডিঙিয়ে তাঁকে পৌঁছাতে হয়েছে প্রত্যাশিত লক্ষ্যে। অত্যন্ত কষ্টকর পরিস্থিতি ও দুঃখময়তার ভেতর দিয়েই তাঁকে অভীষ্ট লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হয়েছে। সারাজীবন ক্ষুধা-দারিদ্র্য এবং সকল প্রকার প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়তে লড়তেই তিনি হয়ে ওঠেন একজন দ্রোহী ঋত্বিক। বাউলিয়ানার বহুবিধ প্রবণতার সঙ্গে তাঁর আপোসহীন দ্রোহী-চেতনা ও সংগ্রামশীলতা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অঙ্গীভূত হয়ে যায়। তাঁর জীবন-সংগ্রামের অভিব্যক্তি অধ্যাত্মবাদী চেতনার মধ্যেও তাই অনিবার্যরূপে সংক্রমিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের কাব্য-পরিক্রমাকে খণ্ডিতভাবে মূল্যায়ন করতে গেলে যেমন তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়; করিমের সৃষ্টি-কর্মকে মূল্যায়নেরও তেমনি সামগ্রিক প্রয়াস জরুরি। তবে অনেকেই করিমের জীবন অথবা গানের বিশেষ কোনো একটি দিক নিয়ে আলোকপাত করেছেন। করিমের গানের নানামুখীনতা সম্পর্কে সামগ্রিক অবয়বটিকে এককভাবে কেউ প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা করেননি। তবে এক্ষেত্রে সংক্ষিপ্তসারে হলেও সুমনকুমার দাশ খানিকটা সক্ষমতা দেখিয়েছেন। তবু এসব রচনা ও গবেষণা-কর্মে অনেক দিক অনালোকিত থেকে যায়।
কারণ করিমকে কেউ বলেন—চারণ কবি, কেউ বলেন—কবি কিংবা লোককবি, কেউ—গণসংগীত শিল্পী বা গণগীতিকার কিংবা গণমানুষের বাউল, কেউ বা আবার—মরমি ধারার শিল্পীও বলেছেন। এসব অভিধার সবকটিই করিমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বরং করিমের গানে প্রতিফলিত বিষয়-ভাবনা ও বক্তব্য, কথা-সুর-ছন্দ মাধুর্যের ব্যাপ্তি এসব অভিধারও অধিক। হয়তো তাই লালন-গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী করিমকে ‘মূলধারার কবি’ বলতেও কুণ্ঠিত হননি। করিমের জীবন ও গানের এই বহুমাত্রিক অনুভবই সামগ্রিক মূল্যায়নের রসদ যোগাবে।
তাত্ত্বিকতা ছেড়ে করিমের গণমুখী গানের অভিযাত্রা ও সফলতাকে অনেকে একমাত্র উপজীব্য করে তাঁর মরমি ভাবধারাকে উপেক্ষা করেছেন। একথা সত্যি যে, চূড়ান্তভাবে করিম বস্তুবাদী দার্শনিকেই পরিণত হয়েছিলেন, কিন্তু এটিও তো উপেক্ষা করবার বিষয় নয় যে, একসময় তিনি অধ্যাত্মবাদী গানও রচনা করেছেন। কেউ কেউ তাঁর এই মরমি ধারাকে মোটেই গুরুত্ব দিতে চাননি। তাঁরা সম্ভবত খেয়াল করেননি যে, আধ্যাত্মিক গানেও মৌলিকত্ব বা স্বাতন্ত্র্য করিমকে অনন্য উচ্চতায় সমাসীন করে।
শাহ আবদুল করিম: আশঙ্কা ও অনুভব’ প্রবন্ধে গবেষক জফির সেতু লিখেন:
বাউলবাদ—আধ্যাত্মিক মতবাদ নয়, এটা নিঃসন্দেহে বস্তুতান্ত্রিক মতবাদ। তাই, বাউলদের সাধনা মূলত কায়ারই সাধনা। বাউল ব্রতে নিখিল নাস্তিই ক্রিয়াশীল থাকে। শাহ আবদুল করিমের গানে লোকায়ত বাউল মতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কসবাদী বিশ্ববীক্ষা।
গবেষকের উল্লিখিত মন্তব্যে একদেশদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়। তাঁর বক্তব্য খানিকটা আপাত বিরোধী বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ বাউলমত অবশ্যই বস্তুতান্ত্রিকতা নির্ভর; কিন্তু বস্তুবাদী প্রাচীন লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া মতের সঙ্গে অধ্যাত্মবাদী চেতনা ধীরে ধীরে আত্তীকৃত হয়ে ক্রমে বহু ধারার সংমিশ্রণে যে বাউল-দর্শন গড়ে উঠেছে—তা তিনি স্বীকার করেননি। এছাড়া বাউলমত কোনো অবিমিশ্র মতাদর্শ নয়। আচার ও বিশ্বাসের বিপ্রতীপ বা সাংঘর্ষিক অবস্থান বাউলাদর্শে রয়েছে; লোকায়ত ঐতিহ্যের এই ঐতিহাসিক সত্যটিকে উপলব্ধি না করে করিমের অধ্যাত্মবাদী চেতনাকে হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না।
গবেষক উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন:
এই আশঙ্কা আমারও। আবদুল করিম একজন গণমানুষের বাউল। মানুষ তার সাধনা ও ব্রত। গণমানুষের জয় ও মুক্তির কথা সমস্ত জীবন তিনি বলে গেছেন। তাঁর ভক্তদের এই জীবনদর্শনে ব্রতী করেছেন। আমাদের উচিত তাঁর এই দর্শনকে লালন করা—তাই বলে তাকে পীর আখ্যায়িত করে, মাজার নির্মাণ করে সম্মান দেখানোর নামে তাঁকে সংকীর্ণ করা—তাঁর জীবন-দর্শনকে শূন্যগর্ভ করার প্রচেষ্টা সমীচীন হবে না।
এমন মন্তব্য ও আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। বাংলাদেশে মাজার-সংস্কৃতির আধিপত্য দেখে এমনটি মনে হতেই পারে। কিন্তু করিমের অধ্যাত্মবাদী চেতনার শেকড় তো লোক-ঐতিহ্যের গভীরেই প্রোথিত। হাজার বছরের ঐতিহ্য লালিত ধারারই তা অনুবর্তন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রত্যক্ষ প্রভাবে প্রত্যেক লোককবিই মেজাজে স্বতন্ত্র। ব্যক্তির চেতনাগত রূপান্তর একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। করিমেরও তাই হয়েছে। তাত্ত্বিক করিম ধীরে ধীরে পরিণত সমাজবাদী তাত্ত্বিকে রূপান্তরিত হয়েছে। তাই বলে তাঁর ঐকান্তিক আত্মানিবেদনের অধ্যাত্মবাদী ধারার গানকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেননি।
আত্মা’র স্বরূপ উপলব্ধির সাধনা তথা ‘মনের মানুষ’, ‘অলখ সাঁই’, ‘অরূপ রতন’ কোনো বস্তুবাদী বিষয় নয়। বাউলের এই মরমি ভাবনাও এ ধারার সাধনার ভাবকেন্দ্রে স্থাপিত। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই লোকায়ত ধারার সাধকেরা রূপ-অরূপ, দেহ-দেহাতীত, লোক-লোকাতীতে পরমের সন্ধান করেন। আর এটাই তো আধ্যাত্মিক ভাব-ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।
প্রগতিশীলতা মানে দৃশ্যমান সত্যকে অগ্রাহ্য করা নয়। বরং তাকে স্বীকার করেই সামগ্রিকতার রূপ-রূপান্তরকে প্রত্যক্ষ করার প্রয়াস থাকতে হবে। তা না হলে ফলাফল হবে উল্টো। করিম হারাবে তাঁর ঐতিহ্যিক ভিত্তিভূমি। পীর বা মাজার হিসেবে নয়, করিম তাঁর উদার জীবনদৃষ্টি ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে মুক্তমনা মানবপ্রেমীদের কাছে আজন্ম পূজনীয় হয়ে থাকবেন। বাউল গানের অভিযাত্রায় আধ্যাত্মিক ভাবনার গান করিমের ভিত্তিভূমি, আর তাঁর গণসংগীত সেই ভিত্তিভূমির ওপর নির্মিত সৌধ।
গতানুগতিকতার বাইরে লোকায়ত সাধকদের এক বিশেষ ধরনের ধর্মসাধনা জীবন-সাধনারই নামান্তর। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতামতটি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য:
“বাংলাদেশেও নৈষ্ঠিক হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের বাইরে এক শ্রেণীর সাধক ছিলেন এবং এখনও আছেন যাঁরা খোদাকে চেয়েছেন এবং চান। হিন্দুদের মধ্যে তাঁররা হলেন বাউল, সাঁই, কর্তাভজা প্রভৃতি। আর মুসলমানের মধ্যে তাঁরা হলেন ফকীর, দরবেশ। তারা কিন্তু মুখে ধর্মের আনুগত্য অস্বীকার করেন না। একদল ফকীর হয়তো নামাজ, রোজা ইত্যাদি ইসলামের অবশ্যকরণীয় কোনো কাজই করেন না। কিন্তু তাঁরা প্রকাশ করেন যে তাঁরা আল্লাহ ও রসুলের ভক্ত। তাঁরা বলেন, সাধারণ মুসলমান আছে শরীয়ত বা ধর্মের আচার নিয়ে। আর, আমরা আছি মারেফাত বা ধর্মের অন্তরঙ্গ নিয়ে। এঁরা জিক্রে মশগুল হন, মারেফতী গানে মাতোয়ারা হয়ে নাচেন, লম্বা চুল, দাড়ি রাখেন, গেরুয়া রঙের আলখাল্লা পরেন। মৌলানা-মৌলবীরা এঁদের বে-শরা ফকীর বলে নাম দেন। তাঁরা এঁদের ইসলামের গণ্ডির বাইরে কাফির বলে ফতোয়া দেন। সত্যই দলীল প্রমাণে এই সমস্ত বে-শরা ফকীর ইসলামের গণ্ডির বাইরে পড়ে। তবু এ কথা সত্য যে, তাঁরা নিজের ভাবে—সে যতই ভুল হোক—খোদার ভক্ত।
উল্লিখিত মন্তব্যটির সারাৎসার যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারলে করিম ভক্ত অনুরাগীদের আশঙ্কা ও উদ্বেগ দুই-ই কেটে যাবে। তাঁর সৃষ্টি-কর্মের আপন মহিমাই তাঁকে স্ব-স্থানে অধিষ্ঠিত রাখবে; এই আশাবাদ অমূলক হতে পারে না।
করিমের সংগীত ও সাধন-জীবনে গান গাওয়া এবং রচনা যুগপৎ ঘটনা। তিনি আপনভাবে ও সুরে কথা বসিয়ে নিরন্তর সৃষ্টি করে গেছেন অসংখ্য গান। তাঁর যে-কোনো ধারার বিষয়-আশ্রিত গানের মধ্যে ঐতিহ্যিক প্রভাব ও পরম্পরা যেমন রয়েছে, তেমনি নিজস্ব জীবন-বীক্ষার আলোকেও রয়েছে জিজ্ঞাসু মনের স্বতঃস্ফূর্ত যুক্তিশীলতা। যা তাঁর গানকে নবতর আবহে ও ভিন্নধর্মী রূপদানে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আধ্যাত্মিক ভাবনার গানেও তিনি অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনে সক্ষমতা প্রদর্শন করেন। গতানুগতিক ধারার মধ্যে থেকেও চেতনার বিবর্তনমূলক রূপান্তর তাঁর অধ্যাত্মবাদী ভাবনার গানগুলোকে অনন্য মাত্রা দান করেছে।
তাই তাঁর সৃষ্টিকর্মের যথার্থ মূল্যায়নে ধারাবাহিক পাঠ বা কালানুক্রমিক অনুসন্ধান জরুরি। আমরা তাঁর সংগীত জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ের গানগুলোকে যদি বিচার-বিশ্লেষণ করি—সেখানে অন্যান্য বাউল-ফকিরদের ঘরানারই সুস্পষ্ট লক্ষণ প্রত্যক্ষ করব। তিনি যেহেতু এ ধারারই উত্তরাধিকার, তাই তাঁর গানের বিষয় ও ভাবে পূর্বসূরীদের প্রভাব থাকবেই।
করিমের অধ্যাত্মবাদী চেতনা-সম্বলিত গানগুলোকে নিম্নবর্ণিত শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়:
ক. আল্লা স্মরণ
খ. নবি স্মরণ
গ. ওলি স্মরণ
ঘ. পির-মুর্শিদ স্মরণ
ঙ. ভক্তিগীতি
চ. মনঃশিক্ষা
ছ. দেহতত্ত্ব
জ. নিগূঢ়তত্ত্ব/সৃষ্টিতত্ত্ব
ঝ. সাধনতত্ত্ব
ঞ. মনমানুষের সন্ধান/আত্মতত্ত্ব
উল্লিখিত বিষয়-কেন্দ্রিক গান রচনা এ ধারায় নতুন কোনো ঘটনা নয়। করিমের গানের অভিনবত্ব ও তাৎপর্য নিহিত রয়েছে তাঁর সহজ-সাবলীল বাণীমাধুর্যে। কঠিন ও দুরূহতম দেহতত্ত্ব, সাধনতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্বমূলক দুর্বোধ্য তাত্ত্বিকতা-আশ্রিত গানকে তিনি এমন সহজ-সরল শব্দে ও ভাবে উপস্থাপন করলেন যা নিঃসন্দেহে অভিনবত্বের দাবি রাখে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নিম্নবর্গ-উচ্চবর্গ, কৃষক-শ্রমিক-জেলে-মাঝি প্রভৃতি শ্রেণি-পেশাজীবী অর্থাৎ সকলের কাছেই তাঁর গান বোধগম্য।
করিমের গানের বাণী-বিন্যাস, সুর-ছন্দ-বর্ণ-গন্ধ, ভাব-বক্তব্য আস্বাদনে বিন্দুমাত্র কারো বেগ পেতে হয় না। কারণ তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, যে গান মূলত সাধারণ মানুষেরই গান, প্রাকৃতজনই যার স্বত্বাধিকারী, সেই লোকায়ত ধারার গান কোনো দুরূহ শব্দবন্ধে, দুর্বোধ্য ভাব ও তাত্ত্বিকতায় আড়ষ্ট হতে পারে না। যাদের জন্য আমরা গান গাইলাম, যাদের গান গাইলাম—তারাই যদি এসব গানের যথার্থ উপলব্ধি করতে না পারে, সকল আয়োজনই তবে ব্যর্থতার নামান্তর। এই বিশ্বাসের সার্থক রূপায়ণে তাঁর গান হয়েছে স্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর।
তাঁর গানের বিষয়-ভাবার্থ অনুধাবনে সহজেই সমর্থ হয় শ্রোতারা। তিনি কঠিন সাধন-তত্ত্বকে এতটাই সহজ-সরল সমীকরণে উপস্থাপন করলেন যে, রবীন্দ্রনাথের ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’ এই চিরায়ত সত্যটিকে অনায়াসেই যেন অতিক্রম করে গেলেন ভাবুক করিম। তাই করিমের গানে আধ্যাত্মিকতার পরিণত ও ভিন্নধর্মী রূপের সন্ধান পেতে হলে উপর্যুক্ত ভাবনার গানসমূহের পর্যালোচনা জরুরি।
অন্যান্য বাউল ও বাউলাঙ্গিকের শিল্পীদের মতোই তিনিও আল্লা-স্মরণ, নবী-স্মরণ পর্বের গান লিখেছেন। তার ঐতিহ্যিক পরিপ্রেক্ষিত হলো—বাউল বা বাউল শিল্পীরা গ্রামে-গঞ্জে বিভিন্ন মঞ্চে বা আসরে গান গাওয়ার সময় শুরুতেই আল্লা-নবীর শান গেয়ে মূল গানে প্রবেশ করেন। কোনো কোনো অঞ্চলে এটিকে ‘বন্দনা-পর্বের’ গান হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
পাঞ্জু শাহ তাঁর গানে আল্লাহকে স্মরণ করেন এইভাবে:
“কুদরত কুদরত চলে সবে
কুদরত আছে আল্লা তোর হাতে
মালেক আল্লার আরশ এই কালেবেতে রয়।
খুঁজে দেখলিনে মান হায়রে হায়॥
তাঁর আর একটি গানে নবী-তত্ত্বের উপস্থাপন দেখতে পাই:
নূরের খবর জানি নাই।
আল্লার নূরে নবীর জন্ম শুনতে পাই॥
নবীর নূরে সারে জাহান, নূর ছাড়া আর কিছু নাই।
বাউল পুরোধা লালনও আল্লা ও নবী স্মরণ পর্যায়ের গান রচনা করেছেন। বাউল মতবাদের যে তত্ত্ব-দর্শন তাতে এ পর্যায়ের গান অন্তর্ভুক্ত থাকবার কথা নয়। তাহলে যার হাতে বাউল দর্শন ও মতবাদ পরিপূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করল, সেই লালন কেন বাউল সাধন-তত্ত্ব-দর্শনের আপাত বহিরাঙ্গের গান লিখলেন? এমন প্রশ্নের উদয় হওয়া অমূলক নয়। কিন্তু বাউলমত যেহেতু বহুধারার মিশ্রণে পরিপুষ্ট মতবাদ সেহেতু এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সমাজের মর্মমূলেই নিহিত রয়েছে।
সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা ও সমাজ-ঐতিহাসিকতার শেকড় থেকেই অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমানের মিলিত আন্তরপ্রেরণা, ঐতিহ্য, কোরান-পুরাণের সম্মিলনের প্রতিফলনই উপর্যুক্ত বন্দনা-পর্বের গানসমূহ। লালনও তাই আল্লা-নবীতত্ত্বের অপূর্ব সমন্বয়ী গান লিখবেন; এটা বিস্ময়ের ব্যাপার নয়। লালন গাইলেন:
আলেফ লাম মিমেতে
কোরান তামাম শোধ লিখেছে॥
আলোয় আল্লাজি, মিম মানে নবি
লামের হয় দুই মানে
এক মানে হয় শরায় প্রচার
আরেক মানে মারফত॥
কিংবা শুধু নবীর শান বা গুণ-কীর্তন বর্ণিত হয় তাঁর গানে:
“আয় গো যাই নবির দীনে।
নবির ডঙ্কা বাজে শহর মক্কা-মদিনে॥
তরিক দিচ্ছে নবি জাহের বাতুনে
অমূল্য দোকান খুলেছেন নবি
যে ধন চাবি সে ধন পাবি
বিনে কড়ির ধন, সেধে দেয় এখন
না লইলে আখেরে পস্তাবি মনে॥
এছাড়াও লালনের ‘পারে কে যাবি নবির নৌকাতে আয়’, সৈয়দ শাহনুরের ‘নুরে কান্দে, কান্দে নুরে ইমামের লাগিয়া’, শাহ আবদুল লতিফের ‘প্রভু হে, ও প্রভু, হে প্রভু তুমি সত্য দয়াময়’, মনোমোহন দত্তের ‘আদম্ খোদা মইত্ কহজি, নূরসে আদম বানায়া, একদম জোদা নেহি’, মেছের শাহের ‘দয়া করে দয়াময় এলাহি আলামিন’, দুদ্দু শাহের ‘খোদারূপে আছেন খোদায়’, ‘নবী মুরিদ হয় যথায়’, শেখ ভানুর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলরে সোনার ময়না’, হাসন রাজার ‘আমি না লইলাম আল্লাজীর নাম’, আরকুম শাহের ‘মিমরে জিম নু আমার চক্ষেরই রতন রে’, রশিদ উদ্দীনের ‘আল্লা আসমান জমিনের নূর’, উকিল মুন্সির ‘দীন দুনিয়ার বাদশা তুমি, উম্মতের জামিন’, ‘ফুলের গন্ধ লাগল না মোর গায়’—আরও অজস্র লোককবির গানে আল্লা-নবী স্মরণ পর্বের গানের বিভিন্ন রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি।
করিমের অসংখ্য গানেও আমরা এ ধারার অনুবর্তন লক্ষ করি। গানের সংখ্যাও অপ্রতুল নয়; বরং অন্যদের চেয়ে বেশি। এর অবশ্য একটি প্রত্যক্ষ কারণ রয়েছে। করিমের সুদীর্ঘ জীবনে দেশে-বিদেশের বহু জায়গায় তিনি গান গেয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে গানও বাঁধতে হয়েছে তাঁকে। অন্য কোনো বাউল শিল্পীর জীবনে এত বেশি জায়গায় গান গাওয়ার সুযোগ ঘটেনি। বন্দনা-পর্বের গানের আধিক্যের কারণ এটি হতে পারে বলে ধারণা করা যায়।
এ ধারার গানে করিমের কাব্যসুষমা কিংবা বাণী-বিন্যাসের সৌকর্য সহজেই চোখে পড়ে:
“বিশ্বপতি খোদা তোমার
মহিমা অপার
রাখো মারো ভাঙো-গড়ো
তুমি বিনে কেবা কার॥
সবাই দেখি যার-তার ভাবে
এ জগতের সৃষ্ট জীবে
নামের মহিমা সবে
গাইতেছে অনিবার॥
আল্লা-নবী স্মরণ পর্যায়ের গান যে বন্দনা পর্বেরই গান, সেটি প্রতীয়মান হয় করিমের এই গানে:
বিসমিল্লা আলহামদুলিল্লা
প্রশংসা আল্লার
এ বিশ্বের মালিক মৌলা
সে বিনে আর কেবা কার॥
সেই সে পবিত্র জনে
স্মরণ করি দিল-ইমানে
নুরনবি পাক-পাঞ্জাতনে
দরুদ সালাম হাজারবার॥
নবি ওলি পির পয়গাম্বার
আউলিয়া আম্বিয়া আল্লার
সবার কাছে সালাম আমার
আমি বান্দা গুনাগার॥
লক্ষণীয়, বন্দনা-পর্বের এই গানে করিম শুধু আল্লা-নবীর শান-কীর্তনেই আবদ্ধ থাকলেন না; বরং তা ওলি-পীর-মুর্শিদ স্মরণ, পিতা-মাতা স্মরণ করে বিষয় ও ভাবকে আরও সম্প্রসারিত করলেন। বাউলাঙ্গিকের গানে এটি প্রচলিত একটি গায়ন-ভঙ্গি এবং তা খুব চমকপ্রদভাবে প্রথমেই শিল্পীরা তা পরিবেশন করে থাকেন।
এই ধারার একটি গানে সুনিপুণভাবে করিম ‘সর্বপ্রাণবাদ’ ও সর্বেশ্বরবাদী দার্শনিক বোধের শৈল্পিক প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ‘সর্বপ্রাণবাদ’ মতবাদের মৌল প্রত্যয় হলো, ‘সবকিছুর মধ্যেই মন বা প্রাণ বিরাজমান’। করিমের গানে ‘প্রাণের প্রাণ হয়ে পরে/ মিছরিতে মিঠা সেজেছো’ পঙ্ক্তিতে এ মতবাদেরই সুস্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়:
জন্মিয়া শুনেছি ভবে তুমি আছ
তুমি চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা
আকাশ বাতাস সৃজিয়াছ॥
এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড গড়ে
জীব সমষ্টি সৃষ্টি করে
প্রাণের প্রাণ হয়ে পরে
মিছরিতে মিঠা সেজেছে॥
সর্বেশ্বরবাদী ভাবনায় সবকিছুর মধ্যেই ঈশ্বর বিরাজ করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তা জীব বা জড়বস্তু যা-ই হোক না কেন। ভাবাবাদী সর্বেশ্বরবাদী দর্শনের মূল তাৎপর্য হলো—ঈশ্বর এক অন্তর্ব্যাপী সত্তা, ঈশ্বরের সাথে জগতের সম্পর্কও অন্তর্ব্যাপী সম্পর্ক। অর্থাৎ ঈশ্বরই সব এবং সবই ঈশ্বর। ঈশ্বর এবং জগত যেন অভিন্ন সত্তা। করিম তাই বলতে পেরেছেন, ‘মিছরিতে মিঠা সেজেছে’।
সুফিবাদের প্রভাবেও এমন ভাবনা বিকশিত হতে পারে। কারণ সর্বেশ্বরবাদী চিন্তা বা মতবাদ সুফিবাদের প্রক্ষেপণ বলেই অনেকে মনে করেন। স্রষ্টার উপস্থিতি বা অস্তিত্বকে করিম কোনো সংকীর্ণতার আবেষ্টনে উপস্থাপন করেননি। আবদ্ধ করতে চাননি বিশেষ কোনো গণ্ডির সীমারেখায়। অন্য লোককবিদের মতো স্রষ্টাকে শুধু ‘আদম সুরত’ কল্পনা করেননি; বরং ব্যক্তিসত্তার নিগড়ে বন্দি না করে স্রষ্টাকে তিনি বিশেষ ‘শক্তি’ হিসেবে জ্ঞান করলেন। করিম গাইলেন:
আল্লার বাড়ি মক্কাশরিফ
বোঝে না মন পাগলে
ব্যক্তি নয় সে শক্তি বটে
আছে আকাশ-পাতালে।
খোদা খোদা প্রতি ঘটে
আল্লা আছে বিশ্বময়
ক্বালবে মোমিন আর্শে আল্লা
হাদিসে তার প্রমাণ রয়॥
একই গানের মধ্যে বিভিন্ন ভাবধারার শৈল্পিক সম্মিলন ঘটানোতে করিমের মুন্সিয়ানা সহজেই চোখে পড়ে। এর অন্যতম কারণ হলো তাঁর যুক্তিবাদী মন ও মুক্ত জীবনদৃষ্টি-জাত প্রণোদনা ও উদ্দীপনা। ফলে আল্লা-নবী-ওলি স্মরণ পর্যায়ের আত্মনিবেদনমূলক গানেও তাঁর সদা জাগ্রত যুক্তিশীলতা বা মুক্তচিন্তার আঁচড় লাগে। এটি তাঁর গানের বিশেষত্বও বটে।
আল্লা বা নবীর শান প্রকাশের মধ্যে দিয়ে করিম সৃষ্টি-তত্ত্বের রহস্য উন্মোচনেও প্রয়াসী হন। জগৎ-জীবন নিয়ে নিত্যকার এসব ভাবনা লোককবিদের ভাবাবেগে দার্শনিকতার উন্মেষ ঘটিয়েছে। আল্লা-নবীর শানের সমন্বিত বাণী-মাধুর্যে করিমের গানও ব্যঞ্জনাধর্মী হয়ে ওঠে:
“নবির ভেদ কে জানতে পারে
জানি মনপ্রাণে এ তিন ভুবনে
নবির সমান খোদায় কেউরে না করে॥
আপে সাঁই নিরঞ্জন প্রেমেরই কারণ
নবিকে করলেন সৃজন আপনার নূরে।
আপে পরোয়ারে আদর করে
দোস্ত বলে ডাকলেন যারে॥
সাজরাতুল একিনে অতিশয় গোপনে
ছিলেন নবিজি ময়ুর আকারে
সামনে আয়না ধরে পাক রাব্বানা
রুহুগণের সৃজন করে॥
করিমের রচনা-সম্ভার হতে উল্লিখিত দ্বিবিধ বিষয়-কেন্দ্রিক গানের অনেক দৃষ্টান্ত দেয়া যাবে। আরেকটি বিশেষ ধাঁচের গান বাউল ঘরানায় দেখতে পাওয়া যায়। সেটি হচ্ছে ‘ওলি স্মরণ’ পর্যায়ের গান। এটি নতুন কোনো ধারা নয়। তবে সাম্প্রতিককালে ‘ওলি স্মরণ’ পর্যায়ের গানের ধারায় কিছুটা বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রকৃত ওলি-আউলিয়া-সুফি-দরবেশদের স্থলে অর্বাচীন পীর-ফকিরদের নিয়ে বিশেষ ‘খানকাহ’ বা ‘মাজার-কেন্দ্রিক’ গানের প্রচলন ঘটেছে।
বাংলাদেশে মাজার-সংস্কৃতি এক শ্রেণির মানুষের কাছে খুবই আদরণীয় এবং গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। এরা অধিকাংশই অর্ধ-শিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর; শিক্ষিত মানুষও যে নেই এমন নয়। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই মাজার-সংস্কৃতির প্রভাবে প্রভাবিত। যে পীর বা ফকিরের নামে মাজার প্রতিষ্ঠিত হয়—তার নামেই গান বাঁধা হচ্ছে। এ ধরনের সংগীত ধারাকে বর্তমানে ‘মাজার গীতি’ বা ‘মাজার সংগীত’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে।
তবে করিমের ‘ওলি স্মরণ’ পর্বের গানের তাৎপর্য ভিন্নতর। গতানুগতিক স্থূল রুচির বিরূপ প্রভাব তাঁর গানকে কখনো আক্রান্ত করেনি। কারণ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য-লালিত মরমি সাধনার অন্যতম উৎসভূমি হলো প্রাচীন শ্রীহট্ট, বর্তমানে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল। এই মাটিতেই অদ্বৈতাচার্যের পিতৃভূমি। শ্রীচৈতন্যের সাধনা ও দীক্ষার প্রভাব পড়েছে এ ভূমিতে। মানুষের মরমি প্রেরণার অনন্ত উৎস হিসেবেই এই পুণ্যভূমিতে শায়িত আছেন অসাম্প্রদায়িক ও উদার মানবতাবাদী প্রেরণার দুই বিখ্যাত সুফি-সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.), হযরত শাহপরাণ (রহ.)।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
৩য় পর্বে পরবর্তী অংশ ——//