কুমিল্লা প্রবীণ সাংবাদিক, শিক্ষক, মানবাধিকার সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সহিদুল হক আর নেই। গত ২০ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টায় রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তিনি দেবীদ্বার-মুরাদনগর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে কুমিল্লার দেবীদ্বার ও মুরাদনগরের সাংবাদিকতা অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মরহুম সহিদুল হক কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাইরা গ্রামের কৃতী সন্তান। দেবীদ্বার সদর এলাকার উত্তরপাড়ায় অবস্থিত ‘জয়ভেরি হাউজ’-এর স্বত্বাধিকারীও ছিলেন তিনি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি দৈনিক ইনকিলাবের দেবীদ্বার প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা ও সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো ‘জয়ভেরি’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা।
আশির দশকের শেষভাগ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে মুরাদনগর এলাকায় সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল সীমিত। সে সময় সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং পেশাগত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেন সহিদুল হক। তাঁর নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠিত হয় দেবীদ্বার-মুরাদনগর প্রেসক্লাব। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের দেবীদ্বার শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সহিদুল হক ছিলেন বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী একজন দেশপ্রেমিক মানুষ। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেন তিনি। স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে মুরাদনগর উপজেলার বাইরা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার চেষ্টা করেন।
দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর আত্মিক সম্পর্ক। প্রায় প্রতিদিনই তিনি ক্লাবে আসতেন। ক্লাবের নিয়মিত ও প্রাণবন্ত পাঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। পত্রিকা পড়া, সাংবাদিকদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নানা খুনসুটিতে তাঁর উপস্থিতি ক্লাবকে মুখরিত রাখত। তাঁর সেই চিরচেনা উপস্থিতি আর কখনো দেখা যাবে না—এ কথা ভাবতেই শোকাহত সহকর্মীদের হৃদয় ভারী হয়ে উঠছে।
সহিদুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের বর্তমান সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “হে আমার অগ্রজ, আমার সহযোদ্ধা! আপনার এই চলে যাওয়া দেবীদ্বার ও মুরাদনগরের সাংবাদিকতা জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আর আমার ব্যক্তিগত জীবনে এটি এমন এক শূন্যতা, যা কোনোদিনও পূরণ হওয়ার নয়।”
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, চার ছেলে ও তিন মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
জানাজা ও দাফন:
পারিবারিক সূত্রে জানানো হয়েছে, মরহুম সহিদুল হকের জানাজার নামাজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় মুরাদনগর উপজেলার বাইরা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
তাঁর মৃত্যুতে বাঙ্গরা উপজেলা প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকেও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মহান আল্লাহর কাছে তাঁর নেক আমলগুলো কবুল এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করার প্রার্থনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের এ কঠিন শোক সইবার শক্তি ও ধৈর্য কামনা করা হয়েছে। আমিন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ সাংবাদিক সহিদুল হক আর নেই দেবীদ্বার-মুরাদনগর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি
By
মো.আনোয়ার হোসাইন
October 21, 2026
পাঠক সংখ্যা৩৫