কতটুকু ‘ওয়াচডগ’, কতটুকু আনুষ্ঠানিকতা?

জাতীয় সংসদে নির্বাহী বিভাগের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে, আইন পর্যালোচনা করতে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরামর্শ দিতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বিএনপি সরকারের প্রধান ও সংসদ নেতা জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ও সংসদীয় বিষয়াদি বিষয়ক একাধিক স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সংসদীয় রাজনীতিতে কমিটি গঠন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া হলেও, কমিটিতে কার অন্তর্ভুক্ত হলেন এবং বিশেষ করে কারা সভাপতি নির্বাচিত হলেন—তা নিয়ে জনমনে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল দেখা যায়।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে সংসদীয় ব্যবস্থার ‘ওয়াচডগ বডি’ বা তদারকি সংস্থা বলা হয়ে থাকে। তবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও কার্যত এ পদগুলোর প্রকৃত পদমর্যাদা, নির্বাহী ক্ষমতা এবং প্রদেয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনেক সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্পষ্টতা থাকে।
সংসদীয় কমিটি যেভাবে গঠিত হয়:
চিফ হুইপের প্রস্তাবে এবং সংসদ নেতার অনুমতিক্রমে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী নির্বাচিত ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠিত হয়। প্রতি কমিটিতে সভাপতিসহ সাধারণত মোট ১০ জন সংসদ সদস্য থাকেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পদাধিকার বলে কমিটির সদস্য হন। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যদি সংসদ সদস্য না হয়ে টেকনোক্র্যাট কোটায় থাকেন, তবে তিনি সরাসরি কমিটির সদস্য হতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে সভাপতির বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি বৈঠকে অংশ নেন। এছাড়া সংসদ সম্পর্কিত কয়েকটি কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের নাম সরাসরি জাতীয় সংসদের স্পিকার অনুমোদন দেন এবং সংসদে ঘোষণা করেন।
পূর্বে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীরাই নিজ নিজ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করার নজির রয়েছে। তবে পরবর্তীতে কার্যপ্রণালি বিধিতে পরিবর্তন এনে সাধারণ সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সভাপতি নির্বাচনের বিধান চালু করা হয়, যা প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে বিরোধী দলের সদস্যদেরও সভাপতি করার রীতি চালু রাখা হয়।

কমিটির সভাপতির পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা:
রাজনৈতিকভাবে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদটিকে বেশ সম্মানিত ও আকর্ষণীয় মনে করা হলেও, ‘রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম’ বা ওয়্যারেন্ট অব প্রিসিডেন্স (Warrant of Precedence) অনুযায়ী কমিটির সভাপতিদের জন্য আলাদা কোনো স্বাধীন পদমর্যাদা নেই। তারা অন্যান্য সাধারণ সংসদ সদস্যদের সমমানের পদমর্যাদা ও সম্মান ভোগ করেন।
তবে দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে সংসদ সচিবালয় ও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কিছু নির্দিষ্ট কাঠামোগত সুবিধা দেওয়া হয়:
১. দপ্তর ও জনবল: জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে সুসজ্জিত একটি কার্যালয় বরাদ্দ পান। কাজ পরিচালনার জন্য একজন ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) এবং একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নিয়োজিত থাকেন।
২. দাপ্তরিক ভাতা: দাপ্তরিক কার্যালয়ে আপ্যায়ন খরচ বাবদ প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
৩. গাড়িতে লোগো ব্যবহার: স্থায়ী কোনো সরকারি গাড়ি, জ্বালানি ও চালকের সার্বক্ষণিক বরাদ্দ না থাকলেও, জাতীয় সংসদের লোগো সংবলিত বিশেষ ফ্ল্যাগ বা লোগো নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়িতে ব্যবহার করার অনুমতি রয়েছে।
৪. বিশেষ অগ্রাধিকার: সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত সরকারি জাতীয় কর্মসূচিতে কমিটির সভাপতিকে বিশেষ অতিথির মর্যাদা দেওয়া হয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ নেতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতেও তারা বিশেষ মর্যাদায় উপবিষ্ট হওয়ার সুযোগ পান।
৫. বৈদেশিক সফর: সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত কোনো সরকারি আন্তর্জাতিক সফর বা বৈদেশিক ডেলেগেশনে সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়।

আইনি ভিত্তি ও কমিটির প্রকৃত ক্ষমতা:
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদকে স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানে সুনির্দিষ্ট দুটি কমিটি—’সরকারি হিসাব কমিটি’ এবং ‘বিশেষ অধিকার কমিটি’ গঠনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সংবিধানে উল্লিখিত ১১টি সংসদ সম্পর্কিত এবং ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়ে থাকে।
সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদের দফা (২) এবং সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে কমিটির কাজ ও ক্ষমতার স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে:
পর্যালোচনা ও তদন্ত: খসড়া বিল ও অন্যান্য আইনি প্রস্তাবনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, আইন বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করা এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত চালানো।
তথ্য তলব: সংশ্লিষ্ট যেকোনো মন্ত্রণালয় বা প্রশাসনিক বিভাগের নিকট থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত তলব এবং প্রশ্নের উত্তর মৌখিক বা লিখিতভাবে গ্রহণে বাধ্য করা।সুপারিশ প্রদান: অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপচয়ের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা মন্ত্রণালয়কে প্রদেয় আইনি ও প্রশাসনিক সুপারিশ করা।

কার্যকারিতা ও বাস্তব রূপ:
আইনগত ও সাংবিধানিক দিক থেকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর হাতে বিশাল ক্ষমতা থাকলেও, বাস্তব অর্থে এই কমিটিগুলোর কোনো নির্বাহী ক্ষমতা (Executive Power) নেই। তারা কেবল তাদের পর্যবেক্ষণ, মতামত ও সংশোধনমূলক সুপারিশ সংসদে বা মন্ত্রণালয়ে পেশ করতে পারে। মন্ত্রণালয়ের জন্য এ সুপারিশ মানা বাধ্যবাধকতা নয়, তবে সংসদীয় রীতি অনুযায়ী এ ধরনের সুপারিশ অগ্রাহ্য করা কঠিন।
একটি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হলো এসব কমিটি। সংসদীয় কমিটিগুলো যদি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির উর্ধ্বে উঠে নিয়মিত মাসে অন্তত একটি করে বৈঠক নিশ্চিত করতে পারে এবং নিরপেক্ষভাবে মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের তদারকি চালায়, তবে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা পায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবগঠিত সংসদীয় কমিটিগুলোর দক্ষতা, সক্রিয়তা ও স্বচ্ছ কর্মকাণ্ডই ভবিষ্যতে নির্ধারণ করবে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংসদীয় তদারকি কতটা কার্যকর রূপ নিচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

পাঠক সংখ্যা৫০৬