বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) গুরুত্বপূর্ণ পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান মাহমুদের নিয়োগ নিয়ে সংস্থাটির প্রকৌশলী মহলে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে পাশ কাটিয়ে এবং অনুমোদিত প্রকল্প কাঠামোর ব্যত্যয় ঘটিয়ে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দাবি, অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে প্রধান প্রকৌশলী অথবা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পর্যায়ের কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা। অথচ হাসান মাহমুদ বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদমর্যাদার কর্মকর্তা এবং জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তাঁর অবস্থান ৪১ নম্বরে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—প্রধান ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে কেন অপেক্ষাকৃত জুনিয়র একজন কর্মকর্তাকে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়া হলো?
নিয়োগে ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ’—দাবি নিয়ে ধোঁয়াশা:
হাসান মাহমুদের নিয়োগের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার কথা বলা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে নিয়োগের প্রকৃত প্রক্রিয়া, সুপারিশ এবং অনুমোদনের বিষয়টি স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন বাপাউবোর একাধিক কর্মকর্তা।
প্রকৌশলী মহলের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার বিষয়গুলো প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
হাসান মাহমুদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও প্রশ্ন:
হাসান মাহমুদের অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, তিনি বাপাউবোর তৎকালীন ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ছাত্রজীবনে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ছাত্রলীগের রাজনীতির অনুসারী ছিলেন।
এছাড়া ভোলায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসান মাহমুদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বগুড়ায় দায়িত্ব পালন নিয়েও অভিযোগ:
২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বগুড়া পানি উন্নয়ন বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হাসান মাহমুদ।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে বগুড়া-শেরপুর এলাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে RFQ, DPMসহ বিভিন্ন কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম করা হয়েছে। একটি নতুন লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানকে বিপুলসংখ্যক কাজ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট টেন্ডার নথি, তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
ভোলায় দায়িত্ব পালনের সময়ও নানা অভিযোগ:
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভোলা পানি উন্নয়ন বিভাগ-২, চরফ্যাশনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হাসান মাহমুদ।
এ সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও তৎকালীন সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বিভিন্ন উন্নয়নকাজে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ঠিকাদারদের কেউ কেউ।
অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি কাজ বণ্টন এবং কাজের অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে অনিয়ম হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং সরকারি তদন্তের তথ্য যাচাই করা জরুরি।
৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ:
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পকে দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি ব্যবস্থাপনা ও সেচ প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
এমন একটি বৃহৎ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নির্বাচনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, কারিগরি দক্ষতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন প্রকৌশলীরা।
৬১ জনকে ডিঙিয়ে’ নিয়োগের অভিযোগ:
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসান মাহমুদের চেয়ে জ্যেষ্ঠ বহু কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে প্রকল্প পরিচালক করা হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, প্রায় ৬১ জন কর্মকর্তাকে পাশ কাটিয়ে এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে এই সংখ্যা এবং কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতার প্রকৃত অবস্থান বাপাউবোর সরকারি নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ:
হাসান মাহমুদের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের গুঞ্জন রয়েছে বলেও দাবি করছেন কয়েকজন প্রকৌশলী। তবে এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য নথি বা তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি।
একইভাবে তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার, রাজধানীর বসিলার মধু সিটিতে বিনিয়োগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ থাকার বিষয়েও নানা কথা রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে প্রকাশ করা সমীচীন নয়।
তদন্ত ও নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রকাশের দাবি:
বাপাউবোর প্রকৌশলী মহলের প্রশ্ন—দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়বহুল প্রকল্পের পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক বিবেচনায় হাসান মাহমুদকে নির্বাচন করা হয়েছে?
তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, পূর্ববর্তী কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সময়কার অভিযোগ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষার বিষয়গুলো তদন্তের দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন, অনুমোদিত ডিপিপি, সংশ্লিষ্ট নোটশিট এবং নিয়োগের সুপারিশ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে হাসান মাহমুদের বক্তব্য এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।